রুশাইদ আহমেদ | ৪ এপ্রিল ২০২৬ , ৩:৪৬:৪৮ প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে সামাজিক সংহতি আজ আর কেবল নৈতিক বা আদর্শগত কোনো আলোচনার বিষয় নয়। এটিকে এখন রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
কেননা দেশের পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকা সামাজিক বিভাজন, তথ্য-বিকৃতির পাঁয়তারা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বঞ্চনার গল্প প্রায়শই সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে সমসাময়িক বাস্তবতায়।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব সামাজিক সংহতির পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেশের লাখ লাখ আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা নানা ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছেন। তবে এত বিপুল সংখ্যক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীদের মধ্য হতে তথ্য যাচাই, ভুয়া খবর শনাক্তকরণ কিংবা তথ্য বিকৃতির সমূহ রূপ চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে অধিকাংশই ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন।
এতে সমাজের ঐক্য ও শান্তি বিনষ্টকারী গুজব ও অপপ্রচার সংশ্লিষ্ট কনটেন্টগুলো সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে। আর বহু মানুষ অসচেতনভাবে তথ্যের সত্যতা যাচাই না করেই সেসব বিশ্বাস করছেন। করছেন দেদারছে শেয়ার, কমেন্ট এবং ইন্টারেকশনও। যা ক্রমেই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস ও বিভাজন সৃষ্টিতে নিয়ামক হয়ে উঠছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন কিংবা সামাজিক নেতৃবৃন্দের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের নিষ্ক্রিয়তার কারণে ক্ষেত্রবিশেষে তা শেষ পর্যন্ত দেশের নানা প্রান্তে সহিংসতা উসকে দিচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বতন ও পরবর্তী বেশকিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলী, সাম্প্রতিক কালের মব সহিংসতার ত্রাস কিংবা সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টির ঝুঁকির মতো বিষয়াদি তারই প্রমাণ।
এই পরিপ্রেক্ষিতে, ডিজিটাল-অ্যানালগ সকল ধরনের মাধ্যমে দেশের স্থিতিশীলতা এবং সার্বিক অগ্রযাত্রা অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে সামাজিক ঐক্য সংক্রান্ত বিষয়াদি প্রসারে আরও অগ্রণী ভূমিকা পালনের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষত, “সামাজিক সংহতি” ধারণাকে এ ক্ষেত্রে একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে পরিগণিত করা যেতে পারে।
মূলত, সামাজিক সংহতি হলো এমন এক ধরনের ধারণা, যার মাধ্যমে সমাজের বিদ্যমান সকল পক্ষের অংশীজনরা পারস্পরিক আস্থার সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম সম্পন্নের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে থাকেন। এর মাধ্যমে সমাজে ছড়িয়ে পড়া গুজব, অপতথ্যের মতো বিভ্রান্তিকর বিষয়বস্তুর মোকাবেলায় সংলাপমূলক প্রক্রিয়াগুলোকে বেছে নেওয়া যেতে পারে। যা স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায় রাখার পথসমূহকে সুগম করে তুলতে পারে বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষকরা।
তবে এই তাত্ত্বিক ধারণাকে স্থানীয় বাস্তবতায় রূপান্তর করা হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থায় এটি খুব একটা সহজ কাজ নয়। কারণ বিভিন্ন সম্প্রদায়, সামাজিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীসমূহের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক সর্বদা এক সরলরেখায় চলে না।
এই প্রেক্ষাপটে সমাজের সকল স্তরের বিদ্যমান গোষ্ঠীগুলোর মাঝে বিরাজমান দ্বন্দ্ব এবং তাদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ওপর নজর রাখা সকল সচেতন নাগরিকের জন্য সমানভাবে জরুরি। এতে করে সমাজের শান্তি ও ঐক্য বিনষ্টকারী আশু ঘটনাবলীর পূর্বাভাসসমূহ সহজে চিহ্নিত করা সহজ হতে পারে।
পাশাপাশি, এরই পরিক্রমায় গ্রহণ করা যেতে পারে আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ বা “আর্লি রেসপন্সেস”-ও, যা সংলাপমূলক প্রক্রিয়াগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা উচিত। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, মব, রাজনৈতিক কোন্দলের মতো বিবদমান ইস্যুতে স্থানীয় পর্যায়ের সহিংসতা বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই এই পথগুলো অনুসরণ করলে সামাজিক সংহতি দৃঢ় হওয়ার সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে বহুগুণে বাড়বে।
তবে মনে রাখা দরকার, প্রতিটি অঞ্চলের সামাজিক কাঠামো, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ও যোগাযোগের ধরন ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। এ কারণে একক কোনো কাঠামো দিয়ে সব এলাকায় যে কোনো সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করাও বোকামি। তাই স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অভিযোজিত পদ্ধতি তৈরি করাই এ ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো কখনো কখনো সামাজিক নেতৃত্ববৃন্দের একটি অংশকে নিজেদেরকেই বিভাজনমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় লিপ্ত হয়ে পড়তে দেখা যায়। এতে পক্ষপাতিত্বের কারণে সামাজিক সংহতি সুসংহতকরণে গৃহীত অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগগুলো মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। তাই সকল স্তরের নেতৃত্বের মাঝে একদিকে যেমন সামাজিক সংহতির বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি, তেমনি সামাজিক সাম্য ও ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণে সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রতি জোর দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে স্থানীয় প্রেক্ষাপটভিত্তিক “আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম”-এর আওতায় কোনো এলাকায় আশু উত্তেজনা বা সংঘাতের পূর্বাভাস যাচাই করে সেখানকার বিদ্যমান সামাজিক সম্পর্ক, সংস্কৃতি ও যোগাযোগের ঘরানার আলোকে উদ্ভূত সংকটের সমাধানে এটির কোনো বিকল্প নেই।
একইসঙ্গে, স্থানীয় পর্যায়ের যুব নেতৃত্বের সম্ভাবনাময় ভূমিকাও দেশের সামাজিক সংহতি অক্ষুণ্ণ রাখার ক্ষেত্রে নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে। কারণ সচেতন তরুণদের রয়েছে দ্রুত তথ্য গ্রহণ, যাচাইকরণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার মানসিকতা। তা ছাড়া, সমাজের অন্যান্য অংশের চেয়ে তারা এখনকার আধুনিক প্রযুক্তিতেও বেশ দক্ষ এবং সামাজিক পরিবর্তন আনয়নে আগ্রহী। তাই সঠিক প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পেলে তারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে সামাজিক শান্তি বিনষ্টকারী অপতথ্য ও গুজবের প্রসার প্রতিরোধ, স্থানীয় সংকট নিরসনে শান্তিপূর্ণ সংলাপ আয়োজন এবং সমাজের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মাঝে পারস্পরিক আস্থা অটুট রাখার মতো কল্যাণকর ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকায় আবির্ভূত হতে পারেন।
তবে এসব কর্মকাণ্ডকে সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে বেশকিছু কাঠামোগত পদক্ষেপ গ্রহণও প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে তরুণ ও সচেতন নাগরিক সমাজের নেতৃত্বে এসব বিষয় তদারকির জন্য মনিটরিং টিম গঠন করে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে ডিজিটাল সাক্ষরতার প্রসারে কাজ করা এ ক্ষেত্রে একটি কার্যকর পথ হতে পারে।
মূলত, বাংলাদেশের মতো বহুমাত্রিক সমাজে সামাজিক সংহতি নিশ্চিত করা মানে কেবল সংঘাতের হার হ্রাস করা নয়। বরং এটি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মর্যাদা ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে একটি টেকসই সমাজ বিনির্মাণের একটি দৃপ্ত পদক্ষেপ। এর অনুপস্থিতিতে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হবে। গণতন্ত্র হারাবে স্থিতিশীলতা। সমাজ হবে বহুধাবিভক্ত। আর এ কারণেই, সামাজিক সংহতি এখন জাতীয় পর্যায়ে অগ্রাধিকার পাওয়ার জোর দাবি রাখে।
লিখেছেন: রুশাইদ আহমেদ, স্নাতক তৃতীয় বর্ষ শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।














