সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি ১ জুন ২০২৬ , ৫:১৫:৩৬ প্রিন্ট সংস্করণ
ভোরের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। তিস্তার বিস্তীর্ণ বালুচর পেরিয়ে ছুটে চলছে একটি ঘোড়ার গাড়ি। গাড়িভর্তি ভুট্টার বস্তা, পাশে বসে আছেন কৃষক। চোখেমুখে ক্লান্তি, তবু এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তাপাড়ের চরাঞ্চলে এ দৃশ্য প্রতিদিনের বাস্তবতা।
যেখানে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার চাকা থেমে যায়, সেখান থেকেই শুরু হয় ঘোড়ার গাড়ির পথচলা। উত্তরাঞ্চলের নদীবেষ্টিত ও দুর্গম চরাঞ্চলে, বিশেষ করে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায়, ঘোড়ার গাড়িই এখনো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাহন। পাকা সড়কের অভাব, বর্ষায় জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে বিস্তীর্ণ বালুচরের কারণে মোটরযান চলাচল প্রায় অসম্ভব। এ কারণেই স্থানীয়রা ঘোড়ার গাড়িকে আদর করে বলেন ‘চরের জাহাজ’।
বর্ষাকালে নৌকা আর শুকনো মৌসুমে ঘোড়ার গাড়িকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় চরবাসীর জীবনযাত্রা।
তিস্তার চরে ধান, গম, ভুট্টা, মরিচ, পেঁয়াজ, তামাক, পাট ও বিভিন্ন ধরনের সবজির ভালো ফলন হয়। কিন্তু উৎপাদিত ফসল বাজারে পৌঁছে দেওয়াই কৃষকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
স্থানীয় কৃষক আবুল কালাম বলেন, “আমাদের চরাঞ্চলের প্রধান যাতায়াত মাধ্যম ঘোড়ার গাড়ি। ভালো রাস্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলে ফসলের আরও ভালো দাম পাওয়া যেত। এখন বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়।”
তরুণ কৃষক আতিকুর রহমান জানান, তার প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ মণ ভুট্টা উৎপাদন হবে। কিন্তু যোগাযোগ সংকটের কারণে প্রতি মণে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, “সরকার আসে, সরকার যায়, অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না।”
শুধু কৃষিপণ্য নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, ওষুধ এবং নির্মাণসামগ্রীও চরাঞ্চলে পৌঁছায় ঘোড়ার গাড়ির মাধ্যমে। জরুরি চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেও এটি চরবাসীর একমাত্র ভরসা।
স্থানীয়দের ভাষায়, ঘোড়ার গাড়িই এখানে ‘অ্যাম্বুলেন্স’। অসুস্থ রোগী, প্রসূতি মা কিংবা দুর্ঘটনায় আহত কাউকে হাসপাতালে নিতে এই বাহনের বিকল্প নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, “গত বছর রাত তিনটায় আমার ছেলের খিঁচুনি ওঠে। কোনো যানবাহন ছিল না। প্রতিবেশীরা ঘোড়ার গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ওই গাড়ি না থাকলে কী হতো, ভাবতেই ভয় লাগে।”
চরাঞ্চলে শিক্ষা ব্যবস্থাও নানা সংকটে জর্জরিত। বালুচর, মাঠ ও খাল পেরিয়ে অনেক দূরের বিদ্যালয়ে যেতে হয় শিশুদের। বর্ষায় পথ ডুবে গেলে বিদ্যালয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী মাঝপথেই ঝরে পড়ে।
স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. মোস্তফা কামাল বলেন, “দূরত্ব ও যোগাযোগ সমস্যার কারণে অনেক শিশু নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে পারে না। ঘোড়ার গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক থাকলে উপস্থিতির হারও বাড়ে।”
ঘোড়ার গাড়ি শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি বহু পরিবারের আয়ের উৎসও। চরাঞ্চলের অনেক তরুণ ও বেকার যুবক ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। একজন চালক দৈনিক গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন।
স্থানীয়রা জানান, চরাঞ্চলে টেকসই সড়ক, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ঘটলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া কমবে এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হবে।
উন্নয়নের ছোঁয়া যখন দেশের নানা প্রান্তে পৌঁছে গেছে, তখনও তিস্তার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল অপেক্ষা করছে মৌলিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য। ঘোড়ার গাড়ির খুরের শব্দ যেন সেই অপেক্ষারই নীরব ভাষা। চরবাসীর প্রত্যাশা, একদিন তাদের জীবনেও পৌঁছাবে উন্নয়নের পূর্ণ আলো।




















