প্রতিনিধি ৭ জানুয়ারি ২০২৬ , ১:০৩:৩০ প্রিন্ট সংস্করণ
যে বাংলাদেশে তিনি ফিরে এলেন সেখানে তৈরি হয়েছে গণতন্ত্রের সম্ভাবনা, আছে অনিশ্চয়তাও। দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী, আধিপত্যবাদী শাসন দেশে প্রতিষ্ঠা করেছিল অধিকার ও বিচারহীনতার পরিবেশ। ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে ছাত্র জনতার আন্দোলন যখন হাসিনার অপশাসনকে চ্যালেঞ্জ করে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও হত্যাকাণ্ড সবাইকে চিরতরে নীরব করে দেওয়ার ব্যর্থ্য চেষ্টা চালায়।
যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়, তাতে আশাবাদের সঙ্গে শঙ্কাও থেকে যায়। এদেশেই ১৯৯০-এর ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানের পর শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক উত্তরণ সম্ভব হয়। কিন্তু ১৯৭১-এ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জিত হলেও পরবর্তী বছরগুলোয় দেশে ব্যাপকভাবে শান্তি বিঘ্নিত হয়।
নিকট অতীতে উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ায় (মধ্যপ্রাচ্য) ক্ষমতা পরিবর্তনে আরব বসন্তের হাওয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে গৃহযুদ্ধ বা নৈরাজ্যে রূপ নিয়েছে।
গত প্রায় দেড় বছরে বাংলাদেশে সংস্কার ও রাজনৈতিক সংলাপের উদ্যোগ সত্ত্বেও রাজনৈতিক গুজব, পতিত শক্তির হুঙ্কার, ষড়যন্ত্রের গন্ধ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা নেতিবাচক আলোচনা সমাজে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করেছে।
সেই প্রেক্ষিতে বিশেষ করে চলমান এবং নির্বাচন-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ অনুধাবন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেই ‘আমরা শান্তি চাই’ কথাটি জোর দিয়ে উচ্চারণ করেছেন। তবুও কৌতুহল জাগে তার এই বক্তব্যের নিগূঢ় অর্থ কী?
সন্দেহ নেই, ২০০৭-এ তার ওপর নির্যাতন, ১৭ বছরের নির্বাসন, ভাই আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু এবং মা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা দিয়ার জেল জুলুম তার মনে ক্ষত তৈরি করেছে এবং তাকে সহ্য করতে হয়েছে দলীয় কর্মী ও দেশবাসীর সঙ্গেই। তাই বলে প্রতিহিংসা ও অশান্তি সৃষ্টি কোনোভাবেই তার রাজনীতি হতে পারে না। সেই সিগন্যাল তিনি দিলেন দেশে ফিরেই।
২৭ বছরের জেল জীবন শেষে নেলসন ম্যান্ডেলা যখন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হন, সেসময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন জীবনের এতগুলো বছর হারিয়ে তিনি কি রাগান্বিত নন? উত্তরে ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘সত্যি বলতে, মুহূর্তের জন্য আমি রাগান্বিত ছিলাম। কিন্তু ভেবে দেখলাম দীর্ঘকাল আমি একজন মুক্ত মানুষ হতে চেয়েছি। রাগ পুষে রাখলে আমি তো মুক্তি পাব না!’
তারেক রহমান কৈশরে বাবা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হারিয়েছেন এক সামরিক অভ্যুত্থান ও দেশ-বিদেশের ষড়যন্ত্রের ফলে, এক হত্যাকাণ্ডে। তিনি ও তার পরিবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিদ্বেষের শিকার হয়েছেন এবং দেখেছেন তাদের প্রতিহিংসাপরায়ণ ও উদ্ধত আচরণ ও বক্তব্য সমাজে ও রাষ্ট্রে কতটা শান্তিভঙ্গ করতে পারে, কোটি কোটি মানুষকেকীভাবে বছরের পর বছর অশান্তিতে বসবাস কত্তে বাধ্য করে।
ব্যক্তিগত এবং এমনকি পারিবারিকভাবে জুলুমের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা দ্বারা তাড়িত হয়ে কোনো রাজনৈতিক উদ্যোগ ও সিদ্ধান্ত নিতে উদ্যত হননি। বরং তিনি পৃথিবীতে শান্তির বার্তা নিয়ে আসা নবী মুহাম্মদ (স.)-এর ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে পুনর্নির্মাণের অঙ্গীকার করেছেন।
দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনে তার পারিবারিক শিক্ষা ও রাজনৈতিক চর্চার মধ্য দিয়ে নিজের সঙ্গে এই বোঝাপড়ায় পৌঁছেছেন যে হাসিনার ফ্যাসিবাদী অপশাসনে ক্ষত সারাতে অপরিহার্য শান্তির পথ। ধ্বংস করা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে শান্তিপূর্ণ পদ্ধতির বিকল্প কিছু নেই। সংক্ষুব্ধ মানুষকে সান্ত্বনা দিতেও দরকার শান্তি।
তার শান্তির ডাকে প্রতিফলিত হয়েছে রাষ্ট্রনায়কসুলভ উচ্চারণ ও দায়িত্ববোধ। তিনি বিশ্বকে এ কথা স্নরণ করিয়ে দিয়েছেন যে বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং যেকোনো বিরধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তিতে বিশ্বাসী দেশ। আজকের বিশ্বায়নের যুগে এবং বাংলাদেশের মতো আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা এবং জাতীয় অবস্থান তুলে ধরতে তার মতো সম্ভাবনাময় রাজনীতিকের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং তার শান্তির ঘোষণা একাধারে তার বিশ্ববীক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নীতির বহিঃপ্রকাশ। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানেন, একদিকে ঝুঁকে পড়া নয়, মডারেশন বা মধ্যপন্থাই বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তি যোগায়।
সেজন্য অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিকেই ফিরতে হয় এবং তিনি শান্তির ওপর এত জোর দিয়েছেন। সেই শান্তির প্রতি যে হুমকি রয়েছে তা তিনি উচ্চারণ করেননি সংবর্ধনার জবাবে। কিন্তু কী করে শান্তি অর্জন ও দীর্ঘস্থায়ী করতে হবে, তার ধারণা দিয়েছেন।
নানা ধর্ম, নৃ-গোষ্ঠীর মানুষকে নিয়ে একটি আধুনিক জাতিরাষ্ট্র সুসংহতকরনের কথা বলেছেন। রাজনৈতিক বিভেদ থেকে দেশের স্থিতিশীলতাকে রক্ষা কর্যে তিনি জাতীয় সমঝোতা এবং রাজনৈতিক ও জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে তিনি স্বাধীনতা, স্বার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন এবং অগ্রগণ্য করেছেন মানুষের নিরাপত্তাকে, যেভাবে একজন মা তার সন্তানের ঘরে ফেরার নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেয়।
তিনি জনতাকে ক্ষমতার ওপর স্থান দিয়েছেন যাতে আর জণগন গুম, খুন, অত্যাচার, হয়রানি, বৈষম্য এবং অধিকার হরণের শিকার না হয়। বিশ্ব ইতিহাসে ভ্লাদিমির লেনিন ও আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনীর মতো বেশ কয়েকজন নেতা নির্বাসন থেকে ফিরে নেতৃত্ব দিয়েছেন স্ব স্ব মতাদর্শের বিপ্লবে, কিন্তু তারেক রহমান ফিরেছেন গণতন্ত্রের প্ততিশ্রুতি নিয়ে এবং দল ও দেশকে নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব দিতে, নিজদ্ব ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে নয়।
অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অশান্তির মাধ্যমে কৃত্রিম শান্তি দেখানো সম্ভব হলেও গণতান্ত্রিক সমাজে মানুষে মানুষে ও রাজনৈতিক শক্তিসমূহের মধ্যে সম্প্রীতি এবং অর্থনৈতিক বন্টন ও প্রতিষ্ঠান কার্যকর করার মাধ্যমে শান্তি স্থাপন ও শান্তির পরিবেশ বজায় রাখতে হয়।
‘দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জন সম্ভব নয় যদি না ব্যাপক জনগোষ্ঠী দারিদ্র থেকে বের হয়ে আসার নানা উপায় খুজে পায়।’ এ পর্যবেক্ষণ নোবেল কমিটির; ২০০৬-এ বর্তমান অন্তর্বর্তী সতকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার সময়কার। আজকের বাংলাদেশের অগ্রাধিকার দুর্নীতিপরায়ণ শাসনে ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যাওয়া এবং ভবিষ্যত শান্তির পথ রচনা করা।
‘আমরা শান্তি চাই’ বলেই তারেক রহমান ক্ষান্ত হননি, রাষ্ট্রীয় শান্তির পথ দেখিয়েছেন। ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫-এ তার নির্বাসন এবং ফ্যাসিবাদী শাসন অবসানের অনেক আগেই, ২০২৩ সালে তার দল বিএনপি সংস্কার ও উন্নয়নের লক্ষ্যে ৩১ দফা ঘোষণা করে অগ্রিম প্রমাণ করেছে ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। তার দল ও দেশের আগামী রাজনীতি হবে শান্তিবাদী, শান্তির উদ্দেশ্যে।




















