ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি: ২২ মে ২০২৬ , ৫:৪০:৩৫ প্রিন্ট সংস্করণ
তৎকালীন ভারতের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম হলেও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আজ বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে অমর হয়ে আছেন। দুঃখ, দারিদ্র্য ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এই কবি শৈশবেই হারিয়েছিলেন মা-বাবাকে। জীবিকার তাগিদে কখনও মসজিদে মুয়াজ্জিন, কখনও লেটো দলে গীতিকার, আবার কখনও রুটির দোকানে শ্রমিক হিসেবেও কাজ করতে হয়েছে তাকে।
১৯১৪ সালে ভারতের আসানসোলের একটি রুটির দোকানে কাজ করার সময় কিশোর নজরুলের অসাধারণ প্রতিভায় মুগ্ধ হন দারোগা রফিজউল্লাহ। তিনি নজরুলকে সঙ্গে নিয়ে আসেন ময়মনসিংহের ত্রিশালে। সেখান থেকেই শুরু হয় কবির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়, যার স্মৃতি আজও বহন করে চলেছে ত্রিশালের দুটি বাড়ি।
ত্রিশাল উপজেলার কাজীর শিমলা গ্রামে অবস্থিত দারোগা রফিজউল্লাহর বাড়িই ছিল নজরুলের প্রথম আশ্রয়স্থল। এখানেই তিনি শিক্ষাজীবনে নতুন সুযোগ পান।
প্রথমে তাকে ময়মনসিংহ সিটি স্কুলে ভর্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরে তিনি ভর্তি হন দরিরামপুর ইংরেজি হাইস্কুলে, যা বর্তমানে ‘নজরুল একাডেমি’ নামে পরিচিত।
কাজীর শিমলা থেকে দরিরামপুরের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ হেঁটে স্কুলে যেতেন কিশোর নজরুল। বর্ষায় সেই পথ হয়ে উঠত আরও কষ্টকর। পরে দারোগা রফিজউল্লাহ তাকে নামাপাড়া গ্রামের কাজী হামিদুল্লাহর বাড়িতে জায়গীর রাখেন।
পরবর্তীতে নজরুল আশ্রয় নেন ত্রিশালের নামাপাড়া গ্রামের বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়িতে। বাড়ির পুকুরপাড়ের একটি ছোট্ট ঘরে কাটে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময়। ত্রিশালের এই দুই বাড়িতে প্রায় এক বছর অবস্থান করেছিলেন কবি।
স্বল্প সময়ের অবস্থান হলেও তিনি ত্রিশালের মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী স্থান করে নেন। শতাধিক বছর পরও সেই স্মৃতি আজও বয়ে বেড়াচ্ছে ত্রিশালের মানুষ।
বর্তমানে কবির স্মৃতিবিজড়িত দুই বাড়িকে সংরক্ষণ করে গড়ে তোলা হয়েছে নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র। নজরুল ইনস্টিটিউটের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই কেন্দ্রগুলোতে সংরক্ষিত রয়েছে কবির স্মৃতিচিহ্ন, পাঠাগার ও মিলনায়তন।
কাজীর শিমলার দারোগা বাড়িতে সংরক্ষণ করা হয়েছে কবির ব্যবহৃত কাঠের খাট। অন্যদিকে বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়িতে রয়েছে একটি পুরোনো গ্রামোফোন এবং কবির নানা ছবি ও হাতে লেখা কবিতার প্রতিরূপ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ প্রচার ও আধুনিক সুবিধার অভাবে দর্শনার্থীর সংখ্যা খুবই সীমিত। স্থানীয়দের মতে, তথ্যসমৃদ্ধ গ্যালারি, অডিও-ভিডিও কর্নার, ডিজিটাল তথ্যসেবা, গাইড সুবিধা ও পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো তৈরি করা গেলে স্মৃতিকেন্দ্রগুলো আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ত্রিশালে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে নজরুল একাডেমি মাঠে বসবে ‘নজরুল মেলা’।
প্রায় দুই যুগ পর জাতীয় পর্যায়ের এ আয়োজনে যোগ দিতে আগামী ২৩ মে ত্রিশালে আসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনের পাশাপাশি একটি খাল পুনঃখনন প্রকল্পের উদ্বোধনও করবেন।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, কবির স্মৃতিবিজড়িত এই স্থানগুলো শুধু ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, বরং বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির এক গৌরবময় উত্তরাধিকার। যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে এগুলোকে জাতীয় পর্যায়ের আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।














