সারাদেশ

৩২ বছরের শিক্ষকতা জীবনের ইতি, পুষ্পবৃষ্টিতে আবেগঘন বিদায় ঠাকুরগাঁওয়ের প্রধান শিক্ষক শাহজাহান-ই-হাবীবকে

  ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: ২৩ মে ২০২৬ , ১২:০০:৫৯ প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষকতা যখন শুধু পেশা নয়, ভালোবাসা, আদর্শ ও মানবিকতার প্রতীক হয়ে ওঠে, তখন বিদায়ের মুহূর্তও হয়ে ওঠে আবেগঘন। এমনই এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার গিলাবাড়ী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়।

দীর্ঘ ৩২ বছর ৪ মাস ২০ দিনের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবনের ইতি টেনে বৃহস্পতিবার (২১ মে) অবসরে গেছেন বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক মো. শাহজাহান-ই-হাবীব। এ উপলক্ষে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমধর্মী বিদায় সংবর্ধনা।

বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তৈরি হয়েছিল আবেগঘন পরিবেশ। ফুল হাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল শত শত শিক্ষার্থী। দুই পাশে ভালোবাসার মানবসারি তৈরি করে তারা বিদায় জানান প্রিয় শিক্ষককে। সেই পথ ধরে সহকর্মীদের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের পুষ্পবৃষ্টিতে সিক্ত হন শাহজাহান-ই-হাবীব।

এ সময় অনেক শিক্ষার্থী আবেগ ধরে রাখতে পারেনি। কেউ জড়িয়ে ধরেছে প্রিয় শিক্ষককে, কেউ পা ছুঁয়ে নিয়েছে দোয়া। আবার কেউ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছে, “স্যার, আপনাকে কখনো ভুলবো না।” শিক্ষার্থীদের এমন অকৃত্রিম ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বিদায়ী শিক্ষকও।

বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা শিক্ষা অফিসার মো. শাহীন আখতারসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

জানা যায়, ১৯৬৬ সালের ৬ জুন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন মো. শাহজাহান-ই-হাবীব। এমএ ও বিএড সম্পন্ন করে ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি নিজ এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্য নিয়ে গিলাবাড়ী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে বিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তার নেতৃত্বে বিদ্যালয়টি শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও জাতীয় দিবস পালনে একাধিকবার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হন এবং তার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয় দুইবার জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

শিক্ষার্থীরা বলেন, “স্যার শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা দেননি, মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিয়েছেন। তিনি আমাদের অভিভাবকের মতো ছিলেন।”

বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলেন, “তিনি শুধু একজন প্রধান শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন এই বিদ্যালয়ের প্রাণ। তার আদর্শ ও স্মৃতি বিদ্যালয়ের প্রতিটি ইটের সঙ্গে মিশে থাকবে।”

অনুষ্ঠানে তাকে সম্মাননা স্মারক, উপহার সামগ্রী ও ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। পরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গাড়িবহরে তাকে বাড়ি পৌঁছে দেন।

বিদায়ী বক্তব্যে শাহজাহান-ই-হাবীব বলেন, “অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এই বিদ্যালয় গড়ে তুলেছি। শিক্ষকতা জীবন শেষ হলেও বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও কল্যাণে আগামীতেও পাশে থাকবো।”

জেলা শিক্ষা অফিসার মো. শাহীন আখতার বলেন, “একজন আদর্শ শিক্ষক কখনো অবসরে যান না, তিনি বেঁচে থাকেন তার শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে। শাহজাহান-ই-হাবীব স্যার এই অঞ্চলের শিক্ষার আলো হয়ে থাকবেন বহুদিন।”

আরও খবর

Sponsered content