বিশেষ প্রতিবেদন

নেত্রকোনায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী হারিকেন ও হুঁকা

  সোহেল খান দূর্জয়, নেত্রকোনা ৪ মার্চ ২০২৬ , ১১:২০:১৬ প্রিন্ট সংস্করণ

 

নেত্রকোনার গ্রাম বাংলায় এক সময় রাতের আলোর বন্ধু হিসেবে পরিচিত হারিকেন আজ শুধু স্মৃতির বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বৈদ্যুতিক বাতি ও এলইডি আলো গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃত হওয়ার ফলে হারিকেন আর গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়। এক সময় গ্রামের ডাকপিয়ন থেকে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত রাতে এই হারিকেন হাতে নিয়ে চলাফেরা করত। পূজা, ঈদ, পার্বণসহ বিভিন্ন উৎসব-আনুষ্ঠানে আলোকসজ্জার কাজেও হারিকেনের ব্যাপক ব্যবহার হতো।

স্থানীয়দের সাক্ষ্য অনুযায়ী, নেত্রকোনার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও বাজারে এক সময় হারিকেন মেরামতের কারিগররা ঘুরে ঘুরে এই কাজ করতেন। জেলা শহরের মাছুয়া বাজারের হারিকেন মিস্ত্রি মোর্শেদ জানান, “১০ বছর আগে পর্যন্ত এই পেশায় সংসার চালাতাম। এখন মানুষ হারিকেন ব্যবহার করে না, তাই অন্য পেশা বেছে নিতে হয়েছে।” মোহনগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী মাঈন উদ্দিন বলেন, “গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। বাজারে এলইডি লাইটের বিকাশে হারিকেনের প্রয়োজন আর নেই। এখন এটি শুধু স্মৃতি।”

হারিকেনের মতো গ্রামবাংলার এক সময়ের ধূমপানের অন্যতম সঙ্গী ছিল হুঁকা। ‘আমার মান কুল মান সব হারাইলাম…’ জাতীয় জনপ্রিয় গান ও ছড়ায় হুঁকার গুরুত্ব চিত্রিত হলেও, আধুনিকতার কারণে হুঁকা গ্রামে প্রায় বিলুপ্ত। তিন-চার দশক আগে গ্রামের বাড়ি-ঘরে হুঁকা উপস্থিতি ছিল সাধারণ; গ্রামীণ অনুষ্ঠান, সালিশ ও জমায়েতেও হুঁকা ছাড়ানো নিয়ম ছিল। প্রভাবশালী বাড়িতে লম্বা পাইপযুক্ত স্ট্যান্ড হুঁকা শোভা ও মর্যাদার প্রতীক হিসাবেও ব্যবহৃত হতো।

নাজিরপুর ইউনিয়নের স্থানীয় বৃদ্ধরা জানান, “আমাদের বাপদাদারা হুঁকা ছাড়াই জীবন কল্পনা করতে পারতেন না। দিনের তিন বেলা খাবারের চেয়ে হুঁকা টানাই ছিল বেশি আকর্ষণীয়। আমরা ৬৫ বছর ধরে এই ঐতিহ্য পালন করছি। কখনো সিগারেট বা বিড়ি ব্যবহার করি নি। এখনো অনেকেই আমাদের বাড়িতে এসে হুঁকা টানার আনন্দ নেন।”

তবে আধুনিককরণের ছোঁয়ায় বাজারে হুঁকার পরিবর্তে ক্ষতিকর নিকোটিনযুক্ত সিগারেট-বিড়ি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে গ্রামের নবীন প্রজন্মের কাছে হুঁকা একটি অজানা বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ঐতিহ্য রক্ষা করা না গেলে হারিকেন ও হুঁকা গ্রামবাংলার সাংস্কৃতিক ও দৈনন্দিন জীবনের স্মৃতি হিসাবেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

আরও খবর

Sponsered content