অপরাধ

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে অবৈধ হোটেল-দোকানের দৌরাত্ম্য, বন ধ্বংসের অভিযোগ

  চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি: ২৭ জুন ২০২৬ , ৯:২৪:৫৩ প্রিন্ট সংস্করণ

হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, যা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বন ও বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য, সেখানে বনভূমি দখল করে অবৈধভাবে হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও দোকানপাট পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বন বিভাগের একাধিক উচ্ছেদ নোটিশের পরও এসব স্থাপনা এখনো বহাল রয়েছে, ফলে বনভূমির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাতটি ছড়াবেষ্টিত এই সংরক্ষিত বন একসময় বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল ছিল। বর্তমানে বনভূমির ভেতরে কাঠ পুড়িয়ে রান্না, প্লাস্টিক ও খাদ্যবর্জ্য ফেলা এবং অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের কারণে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাধবপুর এলাকার মাসুম বিল্লাহ, চিত্ত দেব বর্মা, জুনায়েদ মোল্লা, মোস্তাক ও সাখাওয়াত হোসেন টিপুসহ কয়েকজন ব্যক্তি বনভূমির ভেতরে অবৈধভাবে হোটেল ও দোকান পরিচালনা করছেন। ছোট টং দোকান দিয়ে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে এসব স্থাপনা বড় আকারের রেস্টুরেন্টে পরিণত হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

এছাড়া পুরোনো টিকিট কাউন্টার ব্যবহারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় এসব স্থাপনা টিকে রয়েছে। তবে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, উদ্যানের ভেতরে থাকা কয়েকটি হোটেলে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেচাকেনা হয়। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের কোনো সরকারি হিসাব বা নথি পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ব্যবসা থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় হচ্ছে না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের একটি সরকারি বাংলো দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বনভূমির ভেতরে গবাদিপশুর খামার পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, হোটেলগুলোর খাদ্যবর্জ্য, প্লাস্টিক, টিস্যু ও অন্যান্য আবর্জনা বনভূমির বিভিন্ন স্থানে ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্য খেয়ে বানরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী অসুস্থ হয়ে পড়ছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।

এছাড়া পর্যটকদের দেওয়া চিপস ও বিস্কুটের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে বানরগুলো বন ছেড়ে পুরোনো ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে চলে আসছে। এতে দ্রুতগতির যানবাহনের ধাক্কায় বন্যপ্রাণী মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

উদ্যানে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং তাদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগও উঠেছে। এ বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়া পুরোনো ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎচালিত স্ট্রিটলাইট দীর্ঘদিন ধরে অচল রয়েছে। ফলে রাতের বেলায় নিরাপত্তা ঝুঁকি, চুরি ও ছিনতাইয়ের আশঙ্কা বাড়ছে।

বন সংরক্ষক মো. সানাউল্লাহ পাটোয়ারী বলেন, “বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হবে। বনের ভেতরে এসব কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা তদন্ত করা হবে।”

চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গালিব চৌধুরী জানান, “সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা দ্রুত আহ্বানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, “সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পুলিশের সহযোগিতা চাইলে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।”

সাতছড়ি রেঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহেদি হাসান জানান, “কয়েক মাস আগে কয়েকটি অবৈধ হোটেল ও দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছে। আবারও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার প্রক্রিয়া চলছে।”

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানকে রক্ষায় বনভূমির ভেতরে থাকা সব অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করে নির্ধারিত স্থানে স্থানান্তর করতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

আরও খবর

Sponsered content