নিজস্ব প্রতিবেদক: ২৮ জুন ২০২৬ , ১২:৩৫:২১ প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকার তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা মো. সুমন (১৭) গত ২২ জুন বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন। পরে শুক্রবার আশুলিয়া থানা এলাকার তুরাগ নদ থেকে তার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
শনিবার দুপুরে রানাভোলা এলাকায় সুমনের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায়, দুই কক্ষের বাসার একটিতে তার বাবা মো. শাহ আলম, মা ও বোন শোকাহত অবস্থায় বসে আছেন। ছেলেকে হারিয়ে বাবা-মা বাকরুদ্ধ। সান্ত্বনা দেওয়ার পরও তারা খুব বেশি কথা বলতে রাজি হননি।
সুমন ২২ জুন থেকে নিখোঁজ ছিলেন কি না জানতে চাইলে পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে চাননি। আত্মীয়স্বজনও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন না করার অনুরোধ জানান। তারা শুধু জানান, শুক্রবার খবর পেয়ে তারা মরদেহ গ্রহণ করেছেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সুমনের মোবাইল ফোন ভেঙে ফেলা হয়েছে, মোবাইল থেকে তার সব ছবি মুছে দেওয়া হয়েছে এবং বাসায় থাকা ছবিগুলোও ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। সন্তান হারানোর মানসিক যন্ত্রণা আরও না বাড়াতে তার কোনো স্মৃতি রাখতে চাননি তারা।
একপর্যায়ে “সুমন আহমেদ চৌধুরী” (ইংরেজিতে) নামে একটি ফেসবুক আইডি দেখানো হলে পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা সেটি সুমনের বলে নিশ্চিত করেন। তারা জানান, সুমন কামারপাড়া আড়তে কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। ফেসবুক আইডি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ছয় দিন আগে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একটি শোভাযাত্রার ভিডিওসহ বিভিন্ন দলীয় কার্যক্রমের ভিডিও আপলোড করা হয়েছে।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম দৈনিক মতপ্রকাশকে জানান, স্থানীয়দের দেওয়া সংবাদের ভিত্তিতে ২৫ জুন দিবাগত রাতে আশুলিয়া বাজারসংলগ্ন তুরাগ নদীর পাশের একটি চর থেকে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে নিহতের পরিবার মরদেহটি সুমনের বলে শনাক্ত করে। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন।
তিনি আরও জানান, পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২২ জুন পিকনিকে যাওয়ার কথা বলে সুমন বাসা থেকে বের হন। পরে তিনি তুরাগ নদে পড়ে যান। তিনি সাঁতার জানতেন না। পরিবারের সদস্যরা নদীতে খোঁজাখুঁজি করেছেন। পুলিশ একটি মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টিই জানে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অন্যান্য তথ্য সম্পর্কে তাদের কোনো তথ্য নেই।
সুমনের মরদেহ উদ্ধারের পর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা-কর্মীর ফেসবুক আইডি ও পেজ থেকে প্রচার করা হয়, তুরাগ এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে হামলার পর সাতজন নেতা-কর্মী নিখোঁজ এবং তিন থেকে চারজনের মরদেহ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে এসব তথ্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও গুজব বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। শনিবার সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “তুরাগ নদে ভাসছে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সাত নেতা-কর্মীর লাশ” শিরোনামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের কোনো ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়নি। সবাইকে এসব গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে গাজীপুর মহানগর পুলিশ। কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অপপ্রচারে কেউ যেন বিভ্রান্ত না হন। একই সঙ্গে মিথ্যা তথ্য প্রচারকারীদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ তৎপর রয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের তুরাগ, রূপনগর ও দারুস সালাম থানা, আশুলিয়া থানা এলাকা, ফায়ার সার্ভিস এবং সংশ্লিষ্ট দুটি নৌ পুলিশ ফাঁড়ির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২৪ ও ২৫ জুন তুরাগ নদ থেকে মোট তিনটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তারা হলেন—মো. সুমন, আরিফ হাসান রাকিব এবং রনি মোল্লা।
উত্তরা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা দৈনিক মতপ্রকাশকে জানান, তাদের আওতাধীন তুরাগ থানা, বাউনিয়া ও বিরুলিয়া এলাকায় ২২ জুন থেকে এ পর্যন্ত তুরাগ নদ থেকে আর কোনো মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেনি।
রূপনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নোমান হোসেন দৈনিক মতপ্রকাশকে জানান, ২২ জুন থেকে শনিবার পর্যন্ত তাদের এলাকায় তুরাগ নদ থেকে কোনো মরদেহ উদ্ধার হয়নি।
দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দুলাল হোসেন দৈনিক মতপ্রকাশকে জানান, নৌ পুলিশ গত বুধবার আরিফ হাসান রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় নিহতের চাচা মো. আরশাদুল ইসলাম একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন।
আরিফের চাচা মো. আরশাদুল ইসলাম দৈনিক মতপ্রকাশকে জানান, ২২ জুন বেলা ১১টার দিকে আরিফ বাসা থেকে বের হন। বিকেল চারটার দিকে মায়ের সঙ্গে সর্বশেষ মোবাইলে কথা হয়। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। পরে বুধবার তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মৃত্যুর আগে তিনি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, বিষয়টি পরিবার জানত না। মৃত্যুর পর কয়েকজন ভিডিও ও ছবি দেখানোর পর বিষয়টি জানতে পারেন। কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, সেটিও তাদের জানা নেই। পরে রংপুরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।
আমিনবাজার নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) হুমায়ুন কবির দৈনিক মতপ্রকাশকে জানান, ২৪ জুন সকালে আরিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিন দুপুরে দিয়াবাড়ি ঘাটে গোসল করতে নেমে রনি মোল্লা ডুবে যান। সঙ্গে থাকা লোকজন ঘণ্টাখানেক চেষ্টা করে তাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় সাভার মডেল থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।
রনি মোল্লার বাবা কফিল উদ্দিন মোল্লা দৈনিক মতপ্রকাশকে জানান, তার ছেলে দিয়াবাড়ি এলাকার একটি হোটেলে কাজ করতেন। ২৪ জুন গোসল করতে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। রনির কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল না। তার কিছু মানসিক সমস্যা ছিল এবং মাঝেমধ্যে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেন।
তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান দৈনিক মতপ্রকাশকে জানান, ২২ জুনের পর আশুলিয়া থানা এলাকার তুরাগ নদ থেকে একটি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। ওই দিনের মিছিল, গ্রেপ্তারসহ সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো আশুলিয়া থানা এলাকার মধ্যেই ঘটেছে।




















