আন্তর্জাতিক

তাপপ্রবাহে পুড়ছে ইউরোপ, বিপাকে জার্মানি-পোল্যান্ড

  প্রতিনিধি ২৭ জুন ২০২৬ , ১২:২০:২০ প্রিন্ট সংস্করণ

ভয়াবহ তাপপ্রবাহে পুড়ছে ইউরোপ। শুক্রবার মহাদেশটির অন্তত ১৫ কোটি মানুষ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখি হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু জার্মানিতেই পাঁচ কোটির বেশি এবং ফ্রান্সে তিন কোটির বেশি মানুষ তীব্র গরমে বিপর্যস্ত। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডে জুন মাসের তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড গড়েছে। এ পরিস্থিতিতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, বন্ধ রাখতে হচ্ছে স্কুল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, আর ইউরোপের প্রায় অর্ধেক বড় শহর নজিরবিহীন ‘হিট স্ট্রেস’-এর মুখে পড়েছে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, পশ্চিম ইউরোপে তাণ্ডব চালানো তাপপ্রবাহটি পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে জার্মানি ও পোল্যান্ডে আঘাত হানবে। দেশ দুটিতে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। রাইন নদী অতিক্রমের পর নতুন তাপমাত্রার রেকর্ডও সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জার্মানির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এআরডি জানিয়েছে, প্রাথমিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী শুক্রবার ফ্রান্স সীমান্তবর্তী সারব্রুকেনের কাছে তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি রেকর্ড করা হয়েছে, যা দেশটির নতুন রেকর্ড হতে পারে।

জানা গেছে, ফ্রান্সে তাপপ্রবাহে শিশু থেকে বয়স্ক অন্তত কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার কারণে রেল চলাচল ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় মদ বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, বন্ধ রাখা হয়েছে স্কুল এবং স্থগিত করা হয়েছে খোলা জায়গার বিভিন্ন অনুষ্ঠান।

আবহাওয়া পূর্বাভাস প্রতিষ্ঠান ডোনারভেটার ডট ডির আবহাওয়াবিদ কারস্টেন ব্রান্ট বলেন, ‘সপ্তাহান্তে তাপপ্রবাহ সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছাবে। জার্মানির কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাবে।’

জানা গেছে, রোববার ফ্রাঙ্কফুর্টে অনুষ্ঠিতব্য আয়রনম্যান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের দীর্ঘ দূরত্বের ট্রায়াথলনে তীব্র গরমের কারণে সাইক্লিং ও দৌড়ের পথ কমানো হয়েছে। এ ছাড়া প্রচণ্ড গরমে সড়ক বেঁকে যাওয়া, রেললাইন প্রসারিত হওয়াসহ অবকাঠামোগত ক্ষতির আশঙ্কায় জার্মানির কয়েকটি সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান চলাচল সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।

জাতীয় রেল অপারেটর ডয়চে বান জানিয়েছে, তাপপ্রবাহের কারণে আগামী সপ্তাহের শুরু পর্যন্ত দূরপাল্লার ট্রেনের যাত্রীরা অতিরিক্ত কোনো খরচ ছাড়াই টিকিট বাতিল করতে পারবেন। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, তীব্র রোদে রেল অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বজ্রঝড় ও দাবানলের কারণে সংকেতব্যবস্থা, রেললাইন ও বৈদ্যুতিক তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেড়েছে।

জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় জুন মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। তবে আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সপ্তাহান্তের পর তাপপ্রবাহের তীব্রতা কিছুটা কমতে পারে। রোববার ভারী বজ্রঝড়ের সম্ভাবনাও রয়েছে।

তাপপ্রবাহের প্রভাবে ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক স্থাপনা বন্ধ রাখতে হয়েছে, কৃষিখাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেক হাসপাতাল রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।

রয়টার্স ক্লাইমেট মনিটর জানিয়েছে, এই তাপপ্রবাহে ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে তাপমাত্রা মৌসুমি স্বাভাবিকের তুলনায় সর্বোচ্চ ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হয়েছে। এর জন্য ‘ওমেগা ব্লক’ নামে পরিচিত একটি আবহাওয়াগত পরিস্থিতিকে দায়ী করা হচ্ছে। এতে একটি বিশাল উষ্ণ বায়ুর স্তর দীর্ঘ সময় ধরে নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর আটকে থাকে এবং চারপাশে অপেক্ষাকৃত শীতল বায়ু অবস্থান করে।

তীব্র গরমে বৈদ্যুতিক পাখার চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে এশিয়ার বিভিন্ন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইউরোপে বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছে। উত্তর ইউরোপের অধিকাংশ বাড়িঘর শীত প্রতিরোধের জন্য নির্মিত হওয়ায় প্রচণ্ড গরম মোকাবিলায় সেগুলো ততটা উপযোগী নয়।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, চলতি মাসের শেষ দিকে তাপপ্রবাহটি মধ্য ইউরোপ ও বলকান অঞ্চলের দিকে সরে যাবে।

বিজ্ঞানীদের মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন না হলে এ ধরনের তীব্র তাপপ্রবাহ কার্যত অসম্ভব ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ সপ্তাহের অস্বাভাবিক উষ্ণ রাতের তাপমাত্রা দুই দশক আগের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি সম্ভাব্য হয়ে উঠেছে।

 

আরও খবর

Sponsered content