বিশেষ প্রতিবেদন

পৌষ সংক্রান্তি: ধান, পিঠে আর বাঙালির প্রাণের উৎসব

  ইরি অতনু ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ , ১২:৪৩:২৫ প্রিন্ট সংস্করণ

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। এই অসংখ্য উৎসবের ভিড়ে এমন একটি দিন আসে, যা কেবল ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয়—বরং বাঙালির কৃষিজীবী সভ্যতার জয়গান গেয়ে ওঠে। সে দিনটি হলো পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি। শীতের আমেজ যখন হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় রূপ নেয়, আর নতুন ধানের ঘ্রাণে ম-ম করে বাংলার প্রতিটি উঠোন, ঠিক তখনই বাঙালির হৃদয়ে কড়া নাড়ে এই আনন্দোৎসব।

পৌষ সংক্রান্তি মূলত সূর্যের উত্তরায়ণ গমনের উৎসব। পৌষ মাসের শেষ দিনে সূর্য ধনু রাশি থেকে মকর রাশিতে প্রবেশ করে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাঙালির কাছে এর তাৎপর্য আরও গভীর ও প্রাণের। মাঠের সোনালি ধান যখন কৃষকের গোলায় ওঠে, তখন সারা বছরের হাড়ভাঙা পরিশ্রম শেষে আসে এক পশলা স্বস্তি—আর সেই প্রশান্তিই রূপ নেয় উৎসবে।

“পৌষের শেষে সূর্য যখন দিগন্তে টানে নব রেখা,
বাঙালির ঘরে তখন হর্ষের উল্লাসে পিঠের সুবাস হয় মাখা।”

সংক্রান্তির কয়েক দিন আগে থেকেই বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় এক মধুর ব্যস্ততা। মা-ঠাকুমারা ঢেঁকিতে কিংবা মিলে আতপ চাল গুঁড়ো করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। উঠোন জুড়ে দেওয়া হয় গোবর-মাটির প্রলেপ, তার ওপর ফুটে ওঠে চালের গুঁড়ো বা শ্বেতচন্দনের আল্পনা। ধানের ছড়া, লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ আর নানান জ্যামিতিক নকশায় বাড়ির প্রবেশদ্বার যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।

এই উৎসবের প্রাণ হলো নলেন গুড় ও নতুন চাল। খেজুরগাছের বুক চিরে নেমে আসা মিষ্টি রস যখন উনুনের আঁচে জ্বলে গাঢ় গুড়ে রূপ নেয়, তখন সেই গন্ধে চারপাশ ভারী হয়ে ওঠে। এটি কেবল একটি খাদ্য নয়—এটি বাঙালির মাটির সঙ্গে আত্মিক সম্পর্কের এক অনন্য নিদর্শন।

পৌষ সংক্রান্তি মানেই জিভে জল আনা হরেক রকমের পিঠে। পাটিসাপটা, পুলি পিঠে, দুধপুলি, গোকুল পিঠে, চিতই পিঠে—তালিকা যেন শেষই হয় না। উনুনের পাশে বসে গরম গরম পিঠে খাওয়ার যে আনন্দ, তা আধুনিক নামী রেস্তোরাঁর খাবারের চেয়েও বহু গুণ বেশি মূল্যবান।

ক্ষীর কিংবা নারকেলের পুরভরা পাতলা পাটিসাপটা যেন একেকটি শিল্পকর্ম। গরম দুধে ভেজানো পুলি পিঠে মুখে দিলেই মিলিয়ে যায়—মনে হয় শীতকাল সার্থক।

“হিমেল হাওয়ায় চাদর জড়িয়ে উনুনের ধারে বসা,
পিঠের গন্ধে মজেছে প্রাণ—শীতের এ এক অমোঘ ভালোবাসা।”

পৌষ সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে গ্রামবাংলায় পালিত হয় নানা লোকাচার। পুণ্যের আশায় ভোরে নদীতে স্নান করা হয়, গঙ্গাসাগরের মেলা এই দিনের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। অনেক গ্রামে খড় দিয়ে তৈরি হয় ‘বুড়ির ঘর’ বা ‘ভেড়া ঘর’, যেখানে আগুন জ্বালিয়ে শীতকে বিদায় জানানোর প্রথা আজও আনন্দ জাগায়। নতুন ধানকে লক্ষ্মীর প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়, ঘরদোর পরিষ্কার রেখে আলোয় সাজানো হয় বাড়িঘর।

শহর কিংবা গ্রাম—পৌষ সংক্রান্তির বিকেল মানেই আকাশজুড়ে উৎসব। ঢাকার ছাদ হোক কিংবা কলকাতার পাড়া, রঙিন ঘুড়িতে ছেয়ে যায় আকাশ। ‘ভোকাট্টা’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। এই ঘুড়ি ওড়ানো যেন মানুষের স্বাধীনতা আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

পৌষ সংক্রান্তি কেবল খাওয়ার উৎসব নয়, এটি মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনের এক অনন্য উপলক্ষ। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের মাঝে পিঠে বিনিময়ের মাধ্যমে গড়ে ওঠে সামাজিক বন্ধন। গ্রামবাংলার পৌষ মেলা—নাগরদোলা, মাটির খেলনা আর তেলেভাজার গন্ধে—হয়ে ওঠে এক ক্ষুদ্র বাংলার প্রতিচ্ছবি।

“বেড়া ভাঙা প্রেমে আজ সবাকার ঘর একাকার,
সংক্রান্তির পিঠেতেই মিশে থাকে সম্প্রীতির অঙ্গীকার।”

যান্ত্রিক এই আধুনিক জীবনে অনেক ঐতিহ্য হয়তো ফিকে হয়ে এসেছে, তবু পৌষ সংক্রান্তির আবেদন আজও বাঙালির হৃদয়ে অমলিন। ইট-পাথরের শহরেও যখন ফ্ল্যাটবাড়ির রান্নাঘর থেকে পিঠের সুবাস ভেসে আসে, তখন বোঝা যায়—বাঙালি তার শিকড় ভুলে যায়নি।

পৌষ সংক্রান্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা মাটির মানুষ। প্রকৃতির দানেই আমাদের শ্রেষ্ঠ উৎসব। আগামী দিনেও নতুন ধানের সুবাস আর পিঠের মিষ্টতায় বাঙালির প্রতিটি ঘর ভরে উঠুক উৎসবের আলোয়—এই আমাদের প্রত্যাশা।

আরও খবর

Sponsered content