আন্তর্জাতিক

পোড়া গাড়ি থেকে চার মরদেহ: কিশোর পুত্রের স্বীকারোক্তিতে উন্মোচিত হত্যারহস্য

  তথ্যসূত্র: এনডিটিভি ৩০ মে ২০২৬ , ৭:১০:১৪ প্রিন্ট সংস্করণ

ভারতের রাজস্থানে একটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তথ্য সামনে এসেছে। আজমিরের রাম সিং চৌধুরী, তার দ্বিতীয় স্ত্রী, মা এবং ভাগ্নির রহস্যজনক মৃত্যু হয়। প্রথমে ঘটনাটি একটি সড়ক দুর্ঘটনা বলে মনে হলেও পরে পুলিশ এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্ত শুরু করে। তদন্তকারীদের দাবি, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ এবং দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেই এই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাম সিং চৌধুরী, তার দ্বিতীয় স্ত্রী সুরজ্ঞান, মা পুসি দেবী এবং ভাগ্নি মহিমার মরদেহ একটি আগুনে পুড়ে যাওয়া গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়। শুরুতে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছিলেন, অসুস্থ মাকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে গাড়িতে আগুন ধরে যায় এবং ভেতরে থাকা সবাই নিহত হন।

তবে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় তদন্তকারীরা বেশ কিছু অসঙ্গতি খুঁজে পান। তারা লক্ষ্য করেন, গাড়ির সামনের আসনে কেউ ছিল না। এছাড়া নিহত সুরজ্ঞানের শরীরে আগুন লাগার আগেই ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। এসব তথ্য সামনে আসার পর দুর্ঘটনার তত্ত্ব নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় এবং তদন্তের মোড় ঘুরে যায়।

পুলিশ জানায়, তদন্তের শুরুতেই রাম সিংয়ের ১৭ বছর বয়সি ছেলের আচরণ তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরিবারের অন্য সদস্যরা যখন শোকে ভেঙে পড়েছিলেন, তখন ওই কিশোরকে অস্বাভাবিকভাবে শান্ত দেখা যায়।

তার মা কান্নায় ভেঙে পড়লেও সে নির্লিপ্তভাবে পাশে বসে ছিল, এমনকি চা পান করতে করতে মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল। এই আচরণ তদন্তকারীদের সন্দেহ জাগায় এবং তারা তার ওপর বিশেষ নজরদারি শুরু করেন। আজমিরের পুলিশ সুপার হর্ষবর্ধন জানান, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ওই কিশোর নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে।

পুলিশের দাবি, রাম সিং দ্বিতীয় বিয়ে করার পর থেকেই পরিবারে সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। কিশোরটির মনে বাবার প্রতি ক্ষোভ জমতে থাকে। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাবার আচরণ এবং পারিবারিক পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সে অসন্তুষ্ট ছিল। নিজেকে সে অনেকটা বন্দি জীবনে আটকে পড়া মনে করত।

পরিবারটির বসবাসের ব্যবস্থাও ছিল কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী। অজমের থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে শ্রীরামপুরা গ্রামের একটি নির্জন খামারবাড়িতে রাম সিং তার দুই স্ত্রী, মা এবং ভাগ্নিকে নিয়ে থাকতেন। তদন্তকারীদের ধারণা, ওই কিশোর প্রায় পাঁচ মাস ধরে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করছিল।

পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত কিশোর নিয়মিত অপরাধভিত্তিক ওয়েব সিরিজ ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখত এবং দীর্ঘ সময় অনলাইন গেম খেলত। তদন্তকারীদের মতে, সে অপরাধ সংঘটনের পদ্ধতি, তদন্তকারীদের কার্যক্রম এবং অপরাধীরা কীভাবে প্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা করে, সেসব বিষয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করত।

তদন্তে জানা যায়, ঘটনার আগের রাতে রাম সিং এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী সুরজ্ঞান বিয়ার পান করে ঘুমাতে যান। পুলিশের ধারণা, ওই কিশোর সারা রাত জেগে ছিল এবং ভোর ৪টা পর্যন্ত মোবাইল ফোনে গেম খেলেছিল।

পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর সে রাম সিংয়ের কক্ষে প্রবেশ করে। তদন্তকারীদের দাবি, প্রথমে বাবার কানের কাছে ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয় এবং সেই আঘাতেই তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু এগোয়নি বলে মনে করছে পুলিশ। কারণ রাম সিংয়ের পাশেই ঘুমিয়ে থাকা সুরজ্ঞান আক্রমণের সময় জেগে ওঠেন। তিনি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং চিৎকার শুরু করেন।

পুলিশের ধারণা, চিৎকার শুনে পুসি দেবী ও মহিমাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা ঘরে ছুটে আসেন। ঠিক সেই সময় অভিযুক্ত কিশোরের মা, অর্থাৎ রাম সিংয়ের প্রথম স্ত্রী, এবং তার বোনও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তদন্তকারীদের দাবি, সুরজ্ঞান, পুসি দেবী এবং মহিমাকে হত্যার ক্ষেত্রে তারা কিশোরটিকে সহায়তা করেন।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, পরিবারের আর্থিক বিষয়, জমিজমার লেনদেন এবং ব্যাংক হিসাব পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন মহিমা। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে পরিবারে চাপা উত্তেজনা চলছিল। তদন্তকারীদের মতে, পরিবারের একটি অংশের আশঙ্কা ছিল যে মহিমা এবং সুরজ্ঞান একসঙ্গে রাম সিংকে সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে প্রভাবিত করতে পারেন।

পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটিকে সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। সেই উদ্দেশ্যে মরদেহগুলো একটি গাড়ির ভেতরে রাখা হয় এবং পরে গাড়িটিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়, যাতে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যায়।

তবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পুরো পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দেয়। প্রথমত, নিহতদের একজনের শরীরে পাওয়া ছুরিকাঘাতের চিহ্ন। দ্বিতীয়ত, আগুনে পুড়ে যাওয়া গাড়ির ভেতরে মৃতদেহগুলোর অস্বাভাবিক অবস্থান। তদন্তকারীরা দেখতে পান, চারটি মরদেহই গাড়ির পেছনের অংশে রাখা ছিল, যা দুর্ঘটনার বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

তদন্তকারীদের মতে, শেষ পর্যন্ত অভিযুক্ত কিশোরের অস্বাভাবিক শান্ত আচরণই তাদের সন্দেহকে আরও দৃঢ় করে। সেই সূত্র ধরেই শুরু হয় নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ। আর তাতেই ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে রাজস্থানের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য।

আরও খবর

Sponsered content