প্রতিনিধি ১৪ জুলাই ২০২৬ , ১২:৫৩:৫৫ প্রিন্ট সংস্করণ
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে তরুণ এক রাইডশেয়ার মোটরসাইকেল চালকের আত্মাহুতির ঘটনায় ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এবার বালেন্দ্র শাহ সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছে নেপালের তরুণ প্রজন্ম জেন-জি।
নেপালের সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশের অভিযানের প্রতিবাদে ২৫ বছর বয়সী রাইডশেয়ার মোটরসাইকেল চালক গণেশ নেপালি নিজের শরীরে আগুন দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের আন্দোলনে ফুঁসে ওঠে সারাদেশ।
বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় গত বৃহস্পতিবার কাঠমান্ডুর পাসপোর্ট অফিসের সামনে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, সরকারি জায়গায় মোটরসাইকেল রাখার অভিযোগে কাঠমান্ডু মেট্রোপলিটন পুলিশ গণেশ নেপালির বাইকে হুইল লক লাগিয়ে এক হাজার নেপালি রুপি জরিমানা আদায়ের চেষ্টা করে। গণেশ জরিমানার অর্থ দিতে না পারার কথা জানালেও পুলিশ তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে তর্কাতর্কির মধ্যে তিনি নিজের শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন।
গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় গণেশকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও শুক্রবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এরপরই রাজধানীজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং বিক্ষোভ শুরু হয়।
রোববার শত শত তরুণ বিক্ষোভকারী সিংহদরবার সচিবালয়ের সামনে জড়ো হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘গরিবদের ওপর নির্যাতন বন্ধ কর’, ‘মানবাধিকারকে সম্মান কর’ এবং ‘জবাবদিহি নিশ্চিত কর’।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, কাঠমান্ডু মেট্রোপলিটন পুলিশ দীর্ঘদিন ধরেই আইনগত ক্ষমতার বাইরে গিয়ে দরিদ্র মানুষ, পথের হকার, দিনমজুর ও বস্তিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করছে। তাদের দাবি, মেট্রোপলিটন পুলিশের দায়িত্ব কেবল নগর প্রশাসনের কার্যক্রমে সহায়তা করা ও জনগণের সঙ্গে সমন্বয় রাখা। বলপ্রয়োগ, নাগরিকদের সম্পত্তি জব্দ, শারীরিকভাবে হেনস্তা বা কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। গণেশ নেপালির ঘটনাও সেই ক্ষমতার অপব্যবহারেরই একটি উদাহরণ বলে দাবি করছেন আন্দোলনকারীরা।
বিক্ষোভকারীরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের শাস্তি, অবৈধ গ্রেপ্তার বন্ধ এবং উচ্ছেদ হওয়া বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা সরকারের কাছ থেকে জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ঘটনাটি নিয়ে নেপালের পার্লামেন্টেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। নেপালি কংগ্রেস ও নেপালি কমিউনিস্ট পার্টিসহ বিরোধী দলগুলো সরকারের সমালোচনা করেছে। ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে সরকার পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে নেপাল পুলিশের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল গোবিন্দ থাপলিয়াকে।
রাজনৈতিকভাবে ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, গত বছর জেন-জি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন বালেন্দ্র শাহ নিজেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলন পরবর্তীতে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। সেই আন্দোলনের চাপে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হয়ে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী হন বালেন্দ্র শাহ।
তবে এক বছর না পেরোতেই সেই তরুণ সমাজের একাংশই এখন তার সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। নেপালে বিভিন্ন জেন-জি সংগঠনের অভিযোগ, জনগণের পরিবর্তনের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন বালেন্দ্র শাহ এবং তার সরকার জনবিরোধী নীতি অনুসরণ করছে।
উল্লেখ্য, নেপালে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় আত্মাহুতির ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০২৩ সালে প্রেম আচার্য নামে এক যুবকের আত্মাহুতির ঘটনায় তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন বালেন্দ্র শাহ। এবার একই ধরনের একটি ঘটনার পর সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তিনি নিজেই।
গণেশ নেপালির মৃত্যুকে ঘিরে শুরু হওয়া এই আন্দোলন আগামী দিনে নেপালের রাজনীতিতে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করছেন পর্যবেক্ষকরা। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এবং সরকারের পরবর্তী পদকগর ব্যবস্থাপনার ধারা এখন নেপালের অন্যান্য পৌরসভাতেও ছড়িয়ে পড়ছে।





















