এটিএম রাকিবুল বাসার ২ জানুয়ারি ২০২৬ , ৭:২৯:০০ প্রিন্ট সংস্করণ
নতুন বছর মানেই নতুন প্রত্যাশা। সুস্থ, সুন্দর ও আলোকিত একটি আগামী এটাই সবার চাওয়া। মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়; একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল ও আনন্দময় জীবন। কারণ জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান, প্রতিটি দিনই মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বছরের শুরুতে তাই আমাদের কামনা—মানুষের ভালো থাকার আকাঙ্ক্ষা টিকে থাকুক, ভালোভাবে বাঁচার স্বপ্ন হারিয়ে না যাক। দীর্ঘদিনের অচলায়তন, হতাশা ও অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই নতুন বছরের প্রকৃত তাৎপর্য।
নতুন বছরের তাৎপর্য শুধু রাষ্ট্র, সমাজ বা বৈশ্বিক বাস্তবতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি গভীরভাবে প্রভাব ফেলে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনেও। নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের মধ্যকার সম্পর্ক তাই বর্তমান সময়কে বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটেই আমরা নতুন বছরকে দেখছি একটি সম্ভাবনার দ্বার হিসেবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দেশ এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে। নতুন বছরের শুরুতে আমাদের প্রত্যাশা জুলাই পরবর্তী জাতীয় রাজনীতিতে যে আদর্শিক ও গুণগত পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তা বাস্তবভাবে কাজে লাগাবে। নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকার নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার সুসংহত করা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পথে দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে এটাই মানুষের আশা।
এ কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মানুষ আজ বহুমাত্রিক সংকটে জর্জরিত। ক্রমাগত আর্থিক চাপ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত করেছে। সম্পদের সুষম বণ্টনে চরম ব্যর্থতা, ঘুষ-দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং সংঘবদ্ধ বিশৃঙ্খলার দাপটে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। নতুন বছরে মানুষের প্রত্যাশা , আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার দায়িত্ব নেবে, তারা এসব সংকট মোকাবিলায় দৃঢ়, সুস্পষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। সব সমস্যা এক দিনে সমাধান সম্ভব নয়, কিন্তু আন্তরিকতা, সঠিক দিকনির্দেশনা ও দৃশ্যমান উদ্যোগ থাকতেই হবে।
একই সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশা , নির্বাচনে বিজয়ী দল বা জোট বিজিতদের প্রতি ঔদার্য ও সহনশীলতা প্রদর্শন করবে এবং দেশে প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হবে। মানুষ আর ঘুষ-দুর্নীতি ও পশ্চাৎপদতার ঘূর্ণিতে ঘুরতে রাজি নয়। তারা চায় ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বদলে গণমুখী রাজনীতি—যেখানে মানুষের ন্যূনতম চাহিদা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা অগ্রাধিকার পাবে।
একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে ওঠে শিক্ষার ওপর। দীর্ঘদিন ধরে বাজেটে শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকলেও প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত মানের প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে। শিক্ষা খাতেও গড়ে উঠেছে এক ধরনের দুষ্টচক্র। জুলাই অভ্যুত্থানের পর অনেকেই আশা করেছিলেন, এই খাতে কাঠামোগত সংস্কার ও বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা খুব সীমিতই রয়ে গেছে। ফলে শিক্ষা, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা এখনও এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে বন্দি। নতুন বছরে আমাদের প্রত্যাশা , শিক্ষার মান উন্নয়নে সাহসী ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শিক্ষার মতোই আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত স্বাস্থ্যসেবা। বছরের পর বছর অবকাঠামো, দক্ষ জনবল ও সুশাসনের অভাবে এই খাত নিজেই রুগ্ন। আধুনিক ও মানসম্মত সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এখনও সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অধরা। নতুন বছরে মানুষের প্রত্যাশা , স্বাস্থ্যসেবা খাতে কার্যকর সংস্কার হবে এবং চিকিৎসাসেবা বাস্তব অর্থেই মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে।
জুলাই অভ্যুত্থান জাতির সামনে যে জাগরণের সম্ভাবনা তৈরি করেছে, নতুন বছরে তা বাস্তবায়নের দায় রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্রের সব পক্ষের ওপরই বর্তায়। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে স্বাধীনতার পর কিংবা নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের পরেও আমরা অনেক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছি। সেই ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি আর মানুষ দেখতে চায় না।
নতুন বছরে আমাদের বিশ্বাস বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মুক্তমতের বাংলাদেশ গড়ার যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা দল-মত নির্বিশেষে সবাই উপলব্ধি করবে। কোথায় মূল বাধা, কোথায় সংস্কারের প্রয়োজন তা খুঁজে বের করে অগ্রণী ভূমিকা নেবে রাজনৈতিক দলগুলোই। সুস্থ ও যুক্তিনির্ভর রাজনীতি প্রতিষ্ঠা হবে, আইনের শাসন কার্যকর হবে, মতপ্রকাশের দ্বার থাকবে উন্মুক্ত , এটাই নতুন বছরের স্বপ্ন।
আমাদের প্রত্যাশা, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠান , প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগসহ পুরো কাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবে। নতুন বছর কেবল ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়; এটি হোক মানুষের জীবনে সত্যিকারের পরিবর্তনের সূচনা।
লিখেছেন: এটিএম রাকিবুল বাসার , রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক , দৈনিক মতপ্রকাশ ।















