সম্পাদকীয়

চিকিৎসার পাশাপাশি মানবিকতা নিশ্চিত করার সময় এসেছে

  এটিএম রাকিবুল বাসার ১১ জানুয়ারি ২০২৬ , ২:৫৫:২৫ প্রিন্ট সংস্করণ

ক্যানসার এক জটিল ও দুরারোগ্য রোগ। এই রোগের চিকিৎসা যেমন দীর্ঘমেয়াদি, তেমনি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। দেশের বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থায় ক্যানসার চিকিৎসার খরচ এতটাই বেশি যে, নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের পক্ষে তা বহন করা প্রায় অসম্ভব। ফলে দেশের অধিকাংশ ক্যানসার রোগীর শেষ ভরসা সরকারি জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।

কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—এই হাসপাতালেই সেবাদান ব্যবস্থার চরম ঘাটতি আজ রোগীদের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকলেও বাস্তবে দুপুর ১২টার পর রোগী ভর্তি বন্ধ রাখা হয়। এমনকি জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও রোগীদের অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকতে হয়। এতে করে গুরুতর অসুস্থ রোগীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান।

এই অপেক্ষার দৃশ্য এতটাই বেদনাদায়ক যে, তা যে কাউকে নাড়া দিতে বাধ্য। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা রোগীদের দুর্দশা আরও ভয়াবহ। হাসপাতালে ভর্তির অপেক্ষায় থাকা বহু রোগী ও তাদের স্বজনদের খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হয়। শীতের রাত, খোলা জায়গা, অসুস্থ শরীর—সব মিলিয়ে এটি যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।

অপেক্ষমাণ রোগীদের জন্য অস্থায়ী আবাসন নির্মাণের একটি উদ্যোগ একসময় নেওয়া হলেও তা বাস্তবে কার্যকর হয়নি। এমনকি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় আবাসন নির্মাণের আশ্বাস দিলেও এক মাস পেরিয়ে গেছে, দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ জন রোগী ও তাদের স্বজন মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

সমস্যা শুধু আবাসনের অভাবেই সীমাবদ্ধ নয়। গোসল ও প্রাকৃতিক কর্মের জন্যও নেই পর্যাপ্ত ও মানসম্মত টয়লেট এবং গোসলখানা। এক রোগীর আক্ষেপ , ১২ দিন পর তিনি গোসলের সুযোগ পেয়েছেন । এই একটি কথাই হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।

একটি জাতীয় পর্যায়ের বিশেষায়িত হাসপাতালের এমন অব্যবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত মানুষদের প্রতি ন্যূনতম মানবিকতা ও সহানুভূতি দেখানো রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।

অতএব, জরুরি ভিত্তিতে অপেক্ষমাণ রোগীদের জন্য আবাসন নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি গোসল, টয়লেট ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রোগীরা যেন চিকিৎসার অপেক্ষায় থেকেও সম্মানজনক ও মানবিক পরিবেশে থাকতে পারেন সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে।

সরকারি হাসপাতালের সেবাদান ব্যবস্থায় এমন ঘাটতি দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের জন্য বড় ধরনের দুঃসংবাদ। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালকে আমরা কেবল একটি চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং মানবিক সেবার প্রতীক হিসেবে নতুন করে দেখতে চাই। এখনই সময় , এই হাসপাতালকে নতুন সাজে, নতুন দায়িত্ববোধে গড়ে তোলার।

লিখেছেন:  এটিএম রাকিবুল বাসার , সম্পাদক , দৈনিক মতপ্রকাশ । 

আরও খবর

Sponsered content