নেত্রকোনা প্রতিনিধি ২ জুন ২০২৬ , ৫:১৯:৪৯ প্রিন্ট সংস্করণ
নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার নৈহাটি গরুর হাটে ঈদুল আজহা উপলক্ষে ব্যাপক বেচাকেনা হলেও রাজস্ব আদায় ও সরকারি কোষাগারে জমা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। হাট সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হাট থেকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা আদায় করা হলেও সরকারি কোষাগারে জমা দেখানো হয়েছে মাত্র ১৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা। বাকি অর্থের কোনো সুস্পষ্ট হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না।
অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা খাস আদায়ের কাজে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে আদায়কৃত অর্থের পুরোটা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে একটি অংশ আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন হাট সংশ্লিষ্টরা। নিরাপত্তাজনিত কারণে অভিযোগকারীরা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
জানা গেছে, ঈদুল আজহার আগে শেষ সোমবার অনুষ্ঠিত নৈহাটি গরুর হাটে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে বিপুল সংখ্যক গরু ও অন্যান্য পশু আনা হয়। হাটে প্রবেশ ফি, ইজারা, খাস আদায় এবং অন্যান্য খাত মিলিয়ে প্রায় ৪০ লাখ টাকা আদায় হয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি রহমত আলী বলেন, “সেদিন মোট ৪০ লাখ টাকা খাস আদায় করা হয়েছে। হাট পরিচালনায় ৫৫ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করেছেন। সরকারি কোষাগারে ১৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। বাকি অর্থ হাট পরিচালনার বিভিন্ন ব্যয়ে খরচ হয়েছে। কোনো টাকা আত্মসাৎ করা হয়নি।”
তবে ওই ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট হিসাব সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মানিক আজাদ বলেন, “আমি নির্বাচনমুখী মানুষ। হাটে কত টাকা উঠেছে কিংবা সেই টাকা কীভাবে ব্যয় হয়েছে, সে বিষয়ে আমার কোনো জানা নেই।”
বক্তব্যের জন্য উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিক আহমেদ কমল এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুল্লাহ সোহেলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সরেজমিনে জানা যায়, নৈহাটি বাজার কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বারহাট্টা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. সাজেদুল ইসলাম। তিনি দাবি করেন, “ঈদের আগে অনুষ্ঠিত হাট থেকে ১৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। এর মধ্যে ৮০ হাজার টাকা একটি মাদ্রাসাকে দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে কোনো টাকা তোলার বিষয়ে আমার জানা নেই।”
প্রশাসনের পরিবর্তে বিএনপি নেতারা কেন খাস আদায়ের কাজে যুক্ত ছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “হাট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল ছিল না। তাই বিএনপির নেতাকর্মীদের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছিল।”
তবে বিএনপি নেতাদের দাবি অনুযায়ী ৪০ লাখ টাকা আদায়ের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমি যা জানি, সেটাই বললাম। এর বাইরে কিছু জানি না। কোষাগারে কত টাকা গেছে বা অন্য কোনো হিসাব জানতে ইউএনও এবং জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলতে হবে।”
এ বিষয়ে বারহাট্টা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেলিনা আক্তার বলেন, “রাজস্ব আদায় ও সরকারি কোষাগারে জমা সংক্রান্ত অভিযোগ যাচাই করা হচ্ছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা আর্থিক গরমিলের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে আমি ছুটিতে আছি। কর্মস্থলে ফিরে বিষয়টি খতিয়ে দেখব।”
এদিকে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ইউএনও বিষয়টি দেখভাল করবেন। তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।” এরপর তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
হাট সংশ্লিষ্টদের মতে, বিষয়টি শুধু অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নয়; এটি সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নও। তাদের দাবি, জনগণের সম্পদ হিসেবে হাটের রাজস্ব যথাযথভাবে সরকারি কোষাগারে জমা হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের প্রতি জনআস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।















