প্রতিনিধি ১৬ অক্টোবর ২০২৬ , ১২:০৫:২০ প্রিন্ট সংস্করণ
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে শুক্রবার আবারও বড় ধরনের বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। নির্বাচনী সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা এ আন্দোলনের আগের কর্মসূচি পুলিশ বাধাগ্রস্ত করার কয়েক দিন পর নতুন করে রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
এরই মধ্যে দুই নেতাকে পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
সিজেপি সমর্থকদের দিল্লির ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। তবে ওই এলাকায় সমাবেশের অনুমতি নেই। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দিল্লি পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সেখানে না যাওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছে। জনসমাবেশে বিধিনিষেধ কার্যকর থাকায় তা অমান্য করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, প্রশাসনিক কারণে সেন্ট্রাল পার্ক দুই দিনের জন্য বন্ধ রাখা হবে। তবে অন্য কোনো স্থানে ছোট একটি দলকে জাতীয় পতাকা ওড়ানো এবং জাতীয় সংগীত গাওয়ার অনুমতি দিতে তারা প্রস্তুত।
তবে পিছু হটতে নারাজ দীপকে। ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ বা ‘ত্রিবর্ণ পতাকা ওড়াও’ নামে শুক্রবারের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন তিনি। ভারতের গেরুয়া, সাদা ও সবুজ রঙের জাতীয় পতাকাকে দেশটিতে সাধারণত ‘তিরঙ্গা’ বলা হয়।
দীপকে এক ভিডিও বার্তায় বলেন, “এই কর্মসূচির পর আমাকেও কারাগারে যেতে হতে পারে। কিন্তু আমি চিন্তিত নই। তিরঙ্গা আমার গর্ব, আমি এটি ওড়াব।”
দিল্লিতে পৌঁছাতে না পারলেও দেশের যেখানেই থাকুন, সেখানেই জাতীয় পতাকা ওড়ানো এবং প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
নির্বাচনী তালিকা সংশোধন নিয়ে ক্ষোভ
সিজেপির আন্দোলন শুরু হয়েছিল ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। বেকারত্বে ভোগা কিছু তরুণকে তিনি তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন বলে অভিযোগ। সেই অপমানজনক পরিচয়কেই নিজেদের আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেন দীপকে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনটি ছড়িয়ে পড়ে।
মে মাসে শুরু হওয়া এ আন্দোলন জুলাইয়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে বড় আকার ধারণ করে। আন্দোলনের চাপে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভের অন্যতম দৃশ্যমান প্রতীকে পরিণত হয় ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন।
এবার আন্দোলনকারীদের মূল লক্ষ্য ভারতের নির্বাচনব্যবস্থা। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় ১৩ কোটির বেশি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে বৈধ ভোটারদের ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সিজেপি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে। সংগঠনটির অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পক্ষে কাজ করছে। তবে নির্বাচন কমিশন ও সরকার উভয়ই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আগের কর্মসূচিতে ব্যাপক ধরপাকড়
গত শনিবার সিজেপির বড় সমাবেশের পরিকল্পনা ভেস্তে দেয় পুলিশ। দিল্লিতে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হওয়ার আগেই রাজধানীজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। হাজার হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় বিভিন্ন সড়ক ও মেট্রো স্টেশন এবং আটকানো হয় বিক্ষোভকারীদের।
দীপকে এবং সংগঠনের দুই জ্যেষ্ঠ সংগঠক সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাংকাকে দিল্লিতে বিমান অবতরণের পর উড়োজাহাজের ভেতর থেকেই আটক করা হয়।
বিবিসির প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীসহ বহু মানুষকে আটক করা হয়। বিভিন্ন স্থানের ভিডিওতে পুলিশকে বিক্ষোভকারীদের হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে এবং বাসে তুলতে দেখা গেছে। অন্যত্র জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদেরও দ্রুত ছত্রভঙ্গ করা হয়। আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের হামলার অভিযোগও ওঠে।
বিবিসির ধারণ করা একটি ভিডিওতে বাসের ভেতরে আটক এক বিক্ষোভকারীকে এক পুলিশ সদস্যের চড় মারতে দেখা যায়। বিক্ষোভকারীদের ওপর বলপ্রয়োগের বিষয়ে দিল্লি পুলিশ প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
পুলিশি অভিযানের ব্যাপকতা নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে সিজেপি ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ভারতে জারি থাকা জরুরি অবস্থার সঙ্গে এ অভিযানের তুলনা করে। ওই সময় নাগরিক স্বাধীনতা স্থগিত করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অনুমতিবিহীন সমাবেশ ঠেকানোর জন্য এসব পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল বলে দাবি করেছে পুলিশ। রোববার শান্তি ও সদাচরণ বজায় রাখার শর্তে দীপকে, দাস ও রাংকাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
জন্তর মন্তরে প্রবেশ করে কারাগারে দুই নেতা
এরপর দিল্লিতে অনুমোদিত বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে জন্তর মন্তরের নাম বাদ দেয় পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের রামলীলা ময়দান, বুরাড়ি ময়দান অথবা পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দানে কর্মসূচি পালনের পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে জন্তর মন্তর ভারতের প্রতিবাদ আন্দোলনের ঐতিহাসিক কেন্দ্রগুলোর একটি। অষ্টাদশ শতকে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের জন্য নির্মিত এ স্থাপনাটি সংসদ ভবনের কাছেই অবস্থিত। দীর্ঘদিন ধরে এটি দেশটির বিভিন্ন গণআন্দোলন ও জনঅসন্তোষ প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে পরিচিত।
সিজেপির অভিযোগ, ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে বিক্ষোভকারীদের দূরে সরিয়ে দিয়ে তাদের প্রতিবাদকে কম দৃশ্যমান এবং উপেক্ষা করা সহজ করে তুলতে চাইছে কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কয়েকজন সমর্থককে নিয়ে জন্তর মন্তরে ফিরে যান দাস ও রাংকা। সেখানে তারা ভারতের জাতীয় পতাকা ওড়ান এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।
পুলিশের দাবি, অনুমতি ছাড়াই তারা নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করেন। তাদের কেউ কেউ তালাবদ্ধ ফটক টপকে ভেতরে ঢোকেন এবং আগের মুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেন। পরদিন তাঁদের পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে কারাগারে পাঠানো হয়। আরেক সংগঠক অজিঙ্ক্য শিন্ডেকে শান্তি ও সদাচরণ বজায় রাখার মুচলেকায় মুক্তি দেওয়া হয়।
দুই গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক কারাগারে থাকায় শুক্রবারের কর্মসূচির আগে সিজেপির নেতৃত্ব কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে দীপকে জানিয়েছেন, কর্মসূচি নির্ধারিত সময়েই হবে।
বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার, আদালতের হস্তক্ষেপ নয়
শুক্রবারের কর্মসূচি সামনে রেখে বৃহস্পতিবার দিল্লি পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা নিরাপত্তা ও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বৈঠক করেছেন। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা কনট প্লেসে বড় জমায়েত ঠেকাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ।
এক স্থানীয় ব্যবসায়ীর আবেদনের পরও দিল্লি হাইকোর্ট বিক্ষোভ বন্ধের নির্দেশ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ওই ব্যবসায়ী দাবি করেছিলেন, সমাবেশের কারণে যান চলাচল ও ব্যবসায় বিঘ্ন ঘটতে পারে।
এদিকে, সিজেপির আন্দোলনের পাশাপাশি ভারতের বিরোধী দলগুলোও ভোটার তালিকা সংশোধনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে। তাদের অভিযোগ, বিজেপিকে সুবিধা দিতে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা পরিবর্তন করছে।
গত সপ্তাহে বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী ও অন্য সংসদ সদস্যরা দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয় এবং আটক করে। পরে বিরোধী নেতারা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে অভিযোগ জানান এবং সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করেন।
সোমবারের ওই মিছিলে ছিলেন বামপন্থী সর্বভারতীয় ছাত্র সংগঠন এআইএসএর নেত্রী নেহা বোরা। গত শনিবার বিক্ষোভকারীদের নেতৃত্ব দেওয়ার সময় আটক হওয়ার পর রাহুল গান্ধী ও তার বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রার সঙ্গে মিছিলে অংশ নিতে দেখা যায়।
সিজেপি, ছাত্র সংগঠন ও বিরোধী দলগুলো পৃথকভাবে আন্দোলন করলেও তাদের দাবিগুলো ক্রমেই কাছাকাছি আসছে। সিজেপি নেতাদের গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়ে রাহুল গান্ধী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের জন্য জন্তর মন্তর আবার খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ভোটার যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী দলগুলো মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।















