প্রতিনিধি ৬ আগস্ট ২০২৬ , ১১:১৭:০০ প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির ব্যর্থ পরিকল্পনা নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের পর ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছে ফিফা। একই সঙ্গে সংস্থাটি জানিয়েছে, মরক্কোতে অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ বৈঠকে উপস্থিত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর প্রতি পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
বুধবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানায়, মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রম এবং ব্যবস্থাপনা পর্ষদের উপস্থিত সদস্যরা ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন।
ফিফা জানায়, বিশ্বকাপের মুনাফার একটি অংশ ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ নামে একটি বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিক্রির পরিকল্পনায় যে ভুল হয়েছে, তা স্বীকার করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বীকার করা হয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি ভিন্নভাবে পরিচালনা করা উচিত ছিল।
এ বিষয়ে ফিফা কাউন্সিল ও সদস্য দেশগুলোর ফুটবল সংস্থার কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন ভুল আর না হওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে সংস্থাটি।
মহাসচিব গ্রাফস্ট্রমের এই সমর্থন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কয়েক দিন আগেই তিনি সব কর্মীদের পাঠানো এক বার্তায় গত সপ্তাহের ঘটনাগুলোকে “দুঃখজনক ও নিন্দনীয়” বলে উল্লেখ করে ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিলেন।
ফিফা আরও জানায়, ইনফান্তিনোও মহাসচিবের প্রতি নিজের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
সংস্থাটি স্পষ্ট করেছে, বিশ্বকাপের স্বত্ব বিক্রির বিতর্কিত প্রস্তাবটি এখন সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রতিটি অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ থাকে। এই ঘটনার আলোকে ফিফা ভবিষ্যতে নিজেদের প্রক্রিয়া আরও উন্নত করবে।’
তবে একই সঙ্গে সতর্ক বার্তাও দিয়েছে সংস্থাটি। ফিফার ভাষ্য, তাদের সততা, সুশাসন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের আক্রমণ সহ্য করা হবে না। সংস্থার সুনাম রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রবল সমালোচনার মুখে গত শনিবার ২ হাজার কোটি ডলারের বিতর্কিত পরিকল্পনা প্রত্যাহার করে নেন ইনফান্তিনো। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের প্রায় ২০ শতাংশ বিক্রি করে ৪২০ কোটি ডলার তোলার কথা ছিল। প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে থাকত একটি নতুন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান, যার প্রতিষ্ঠাতা জশুয়া কুশনার। তার ভাই জ্যারেড কুশনার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা।
তবে মরক্কোর বৈঠকের পরও ইনফান্তিনোর ওপর চাপ কমবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
বুধবারই ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোর সংগঠন—যার সদস্য ইংল্যান্ড, স্পেন ও ইতালির শীর্ষ লিগ—ফিফার শাসনব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি জানায়। তাদের মতে, বিশ্বকাপের স্বত্ব বিক্রির প্রস্তাব ছিল “বিপজ্জনক” এবং এটি ফিফার পরিচালনা, অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
সংগঠনটি বলেছে, ‘এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যেখানে ফুটবলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে।’
এর আগে পর্তুগালের কিংবদন্তি লুইস ফিগোও ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করে বলেন, তিনি সভাপতির পদটির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছেন।
এদিকে, ব্রিটিশ গণমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সভাপতির পদে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা হিসেবে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপের ফাইনাল আয়োজনের প্রতিশ্রুতি মরক্কোকে দিয়েছিলেন ইনফান্তিনো। তবে সেই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে ফিফা।
সংস্থার একজন মুখপাত্র বলেন, ‘২০৩০ সালের বিশ্বকাপের ফাইনাল আয়োজন নিয়ে ফিফা সভাপতি কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—এমন দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর। যথাসময়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
একই দিনে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেন। তার মতে, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে পরামর্শ না করে ইনফান্তিনো ‘মারাত্মক’ শাসনগত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।
কার্নি বলেন, ‘নিশ্চিতভাবেই ইনফান্তিনোর প্রতি আমার আর কোনো আস্থা নেই।’
মার্চে ফিফার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে একের পর এক বিতর্কে ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
বিশেষ করে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নেয়। বিতর্কিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে গেলে বিশ্বকাপ বয়কটের সিদ্ধান্তও নিয়েছিল তারা। পরিকল্পনা প্রত্যাহারের পরও ফিফার নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারানোর কথা জানিয়েছে সংস্থাটি, যা ভবিষ্যতে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথ খুলে দিতে পারে।
উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল সংস্থাও অভিযোগ করেছে, ফিফার বর্তমান নেতৃত্ব ফুটবলের স্বার্থকে আর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে না।
ফিফার ভেতরেও বিভক্তির ইঙ্গিত মিলেছে। বৈশ্বিক ফুটবল উন্নয়ন প্রধান আর্সেন ওয়েঙ্গার বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো গত সপ্তাহে পদত্যাগ করেছেন। আর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেভিন লামুর অভিযোগ করেছেন, সভাপতির অস্বচ্ছ আচরণে কর্মীরা নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন।
সব বিতর্কের মধ্যেই আগামী মার্চের নির্বাচনে চতুর্থ ও শেষ মেয়াদের জন্য লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইনফান্তিনো।





















