প্রতিনিধি ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৫:১১:৫৬ প্রিন্ট সংস্করণ
জনস্বার্থের তোয়াক্কা না করে সাত মাসে দুই দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো সরকারের দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ বলে দাবি করেছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলটি বলেছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, পরিবহন ও আমদানি ব্যয় বাড়ার বাস্তবতা থাকলেও এর পুরো চাপ একসঙ্গে জনগণের ওপর না চাপিয়ে ধাপে ধাপে ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে দাম সমন্বয় করা যেত।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিজয়নগরে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি: জনস্বার্থ ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে দলের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন দলের ছায়া সরকার বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। এর মধ্যে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। কৃষি, সেচ, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে ডিজেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় এ মূল্যবৃদ্ধির বহুমাত্রিক প্রভাব পড়বে কৃষক, শ্রমিক, পরিবহন খাত ও সাধারণ ভোক্তার ওপর।’
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু সেই চাপ একবারে জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে হবে—এমন কোনো নীতি নেই। আমাদের প্রয়োজন প্রাইস শক নয়, প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্ট।’
এবি পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, ‘ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ পাম্প, পাওয়ার টিলার, হারভেস্টার ও অন্যান্য কৃষিযন্ত্র পরিচালনার ব্যয় বাড়বে। ফলে কৃষিপণ্য উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। সামনে বোরো মৌসুম হওয়ায় এর প্রভাব আরও গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি বলেন, ‘আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর আরও চাপ তৈরি করবে।’
মঞ্জু বলেন, ‘জ্বালানির দাম বাড়লে বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বাড়ে। এর প্রভাব পরিবহন ব্যয় থেকে পাইকারি ও খুচরা বাজারে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপর পড়ে। শুধু প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে—এভাবে দেখলে বাস্তব অর্থনীতির পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। জ্বালানির দাম বাড়ে, পরিবহন খরচ বাড়ে, এরপর পণ্যের দাম বাড়ে।’
সংবাদ সম্মেলনে ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান বলেন, ‘সরকার জানিয়েছে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বেশি দামে জ্বালানি কিনে কম দামে বিক্রি করায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে।’
তিনি বলেন, ‘এ চাপ বাস্তব হলেও আন্তর্জাতিক বাজারদর, পণ্য পরিবহন ব্যয়, বিমা, বিনিময় হার, কর, পণ্য খালাস ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় এবং বিপিসির প্রকৃত ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করা প্রয়োজন।’
নোমান বলেন, ‘সংকটকালীন সময়ে আমদানি শুল্ক ও কর সাময়িকভাবে সমন্বয়, বিপিসির দক্ষতা বৃদ্ধি, অপচয় ও জ্বালানি চুরি বন্ধের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।’
তিনি সরকারের প্রতি ১১ দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো—
১. কৃষি, সেচ, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত ডিজেলের ওপর চাপ কমাতে পৃথক মূল্যনীতি গ্রহণ।
২. একবারে বড় মূল্যবৃদ্ধির পরিবর্তে ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয়।
৩. আন্তর্জাতিক বাজার, পণ্য পরিবহন ব্যয়, বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় ও করের ভিত্তিতে স্বচ্ছ ও সূত্রভিত্তিক মূল্য নির্ধারণব্যবস্থা কার্যকর করা এবং দাম কমলে জনগণকে এর সুফল দেওয়া।
৪. সংকটকালে আমদানি শুল্ক ও কর সাময়িকভাবে সমন্বয়ের বিষয় বিবেচনা করা।
৫. প্রকৃত কৃষক ও কৃষিযন্ত্রের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ডিজেল সহায়তা চালু করা।
৬. জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সুযোগে অযৌক্তিক পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি ঠেকাতে কার্যকর ভাড়া সমন্বয়ব্যবস্থা চালু করা।
৭. বিপিসির আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ, পণ্য ক্রয়, ব্যবস্থাগত ক্ষতি ও জ্বালানি চুরির ওপর স্বাধীন পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা করা।
৮. সীমান্তপথে জ্বালানি পাচার বন্ধে ডিজিটাল নজরদারি ও চোরাচালান চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
৯. সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত জ্বালানি জরুরি তহবিল গঠন করা।
১০. সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির নিরীক্ষা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করা।
১১. দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগ বাড়ানো।
ব্যারিস্টার নোমান বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে নীতি গ্রহণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা মেনে নিয়েও জনগণের ওপর এককালীন বড় মূল্য-শক এড়ানো সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের রাজস্ব বাড়াতে হবে, কিন্তু মানুষের পকেট কেটে নয়। কর ফাঁকি বন্ধ, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ এবং প্রগতিশীল রাজস্ব আহরণের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রয়োজন প্রাইস শক নয়, প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্ট; প্রয়োজন এককালীন চাপ নয়, বরং স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য ও ন্যায়সংগত জ্বালানি মূল্যনীতি।’
সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূইয়া, অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা, মো. আলতাফ হোসাইন, শাহাদাতুল্লাহ টুটুল, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খানসহ দলের কেন্দ্রীয় ও মহানগরের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) গাজী নাসির, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির আহ্বায়ক কেফায়েত হোসাইন তানভীর, গণশিক্ষা ও পাঠাগার বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার ফারুক, গণপরিবহন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান, সদস্যসচিব সামিউল ইসলাম সবুজ, মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব বারকাজ নাসির আহমদ, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির সদস্যসচিব তোফাজ্জল হোসাইন রমিজ, সহসাংগঠনিক সম্পাদক শাহজাহান ব্যাপারী, নাটোর জেলার আহ্বায়ক মোকাররেবুর রহমান নাসিমসহ অন্যান্য নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।





















