জাতীয়

২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন : মির্জা ফখরুলকে ঘিরে আলোচনা, প্রার্থী দেবে না জামায়াত

  নিজস্ব প্রতিবেদক ৮ আগস্ট ২০২৬ , ১:৩০:৩১ প্রিন্ট সংস্করণ

আগামী ২০ আগস্ট দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র দাখিল, ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে দলীয় সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। দলের স্থায়ী কমিটি রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দিয়েছে।

এদিকে আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির শীর্ষ নেতাদের ভাষ্য, সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তাদের প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার বাস্তবসম্মত কোনো সুযোগ নেই। ফলে এবারও ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতি পদে একজন সক্রিয় ও অভিজ্ঞ রাজনীতিককে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে দলটির মধ্যে আলোচনা চলছে। সেই আলোচনায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম গুরুত্ব পাচ্ছে।

দলীয় সূত্রের দাবি, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এসব আলোচনায় মির্জা ফখরুলের নামই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নেতারা জানিয়েছেন।

বিএনপি নেতাদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দল পরিচালনায় ভূমিকা এবং জাতীয় রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্যতার কারণে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি পদের জন্য বিবেচনায় রয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে বিএনপি যখন নানা রাজনৈতিক সংকট ও দমন-পীড়নের মুখে পড়ে, তখন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও পরে মহাসচিব হিসেবে দেশে থেকে দলকে সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

দলের এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারেক রহমান বিদেশে অবস্থান করেও দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আর দেশের রাজনীতির মাঠে থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম সংগঠিত করা এবং দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুলের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে দলের নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশ তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চান।

মির্জা ফখরুল ছাড়াও রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খানের নাম আলোচনায় রয়েছে। আলোচনায় রয়েছে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকারী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নামও। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নামও বিভিন্ন মহলে শোনা যাচ্ছে।

তবে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে শেষ সিদ্ধান্ত নেবেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টি তার ওপর ছেড়ে দিয়েছে।

মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি করার বিষয়ে বিএনপির ভেতরে ভিন্নমতও রয়েছে। দলের একটি অংশ মনে করে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে রাষ্ট্রপতি করা উচিত। অন্য অংশের মত, সরকার ও দল পরিচালনায় মির্জা ফখরুলের মতো অভিজ্ঞ নেতার সক্রিয় ভূমিকা এখনো প্রয়োজন।

দলীয় নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপিকে নতুন মহাসচিব নিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়েও নতুন মন্ত্রী নিয়োগের প্রয়োজন হবে। ফলে সরকার ও দল—দুই জায়গাতেই নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস করতে হবে।

এদিকে গতকাল শুক্রবার তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের একটি বক্তব্যকে ঘিরে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য মনোনয়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

রাজধানীতে টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেখানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন তাকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের একজন বর্ষীয়ান নেতা হিসেবে উল্লেখ করেন।

মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সবাই জানি, আজকের এই সেমিনারের মাননীয় প্রধান অতিথি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের একজন বর্ষীয়ান নেতা। রাজনৈতিক অঙ্গনে তার যে প্রজ্ঞা এবং সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের সঙ্গে তার যে মিথষ্ক্রিয়া, সেটা অনুকরণযোগ্য। আমি তার বাকি জীবনের উত্তরোত্তর শুভকামনা করছি।’

এরপর তিনি বলেন, ‘প্রধান অতিথি হিসেবে আজকে তার সামনে কথা বলার সুযোগ পেলাম। আনুষ্ঠানিকভাবে ভবিষ্যতে পাব কি না, সেজন্য একটু আগে আগে জানিয়ে রাখলাম।’

মন্ত্রীর বক্তব্যের শেষ অংশটি রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা ও জল্পনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে এটিকে আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে পরোক্ষ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। যদিও জহির উদ্দিন স্বপন তার বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বা কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করেননি।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তারা যাকে প্রার্থী করবে, তিনিই নির্বাচিত হবেন। এ কারণে জামায়াত এ নির্বাচনে প্রার্থী দিচ্ছে না।

তবে তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়ে বিএনপি সংসদের বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের মতবিনিময় বা পরামর্শ করেনি।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন।

একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তবে যাচাই-বাছাই শেষে একজন মাত্র বৈধ প্রার্থী থাকলে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। সে ক্ষেত্রে তাকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন।

সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান অনুযায়ী, একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।

সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালে সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদে ভোটাভুটি হয়েছিল। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।

এরপর থেকে প্রতিটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে আসছেন।

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনয়নে নির্বাচিত ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

আরও খবর

Sponsered content