শেখ রফিক ৪ নভেম্বর ২০২৫ , ৫:০০:৩৩ প্রিন্ট সংস্করণ
গত ১৪ মে ২০২৫ প্রধান উপদেষ্টা চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনকালে বলেন, ‘মাঝে মাঝে প্রশ্ন শুনি যে, বিদেশিকে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আপনারা ভারতে স্বাস্থ্যসেবার জন্য যান না? যখন বন্ধ করে দিয়েছে তখন দলে দলে হাহাকার করেছেন যে, কেন বন্ধ করে দিল। কারণ হচ্ছে, আমাদের এখানে ভালো স্বাস্থ্যসেবা নেই। খবরের কাগজে আমরা দেখি নেতারা সিঙ্গাপুর, ব্যাংককে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন। অথচ বন্দরে কেউ আসতে পারবেন না! কিন্তু আমাদের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড এই বন্দরের চিকিৎসা দরকার! বাইরের ডাক্তার আনতে হবে তো, উপায় নেই আমাদের। পৃথিবীর সেরা চিকিৎসক আমাদের দরকার যেন এই অর্থনীতির হৃৎপিণ্ডকে তারা বিরাট আকারে বানিয়ে দিতে পারে, কোনো সমস্যা যেন আমাদের না হয়। আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো আরও ১০ রকম জাতি আমাদের চেয়েও খারাপ অবস্থা থেকে আমাদের ডিঙিয়ে শত শত মাইল আগে চলে গেছে। আমরা কেন হতভাগা জাতি হলাম?’
‘অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড’কে আধুনিক করতে হলে বিদেশি পরিচালনায় দিতে হবে এবং এতে দেশীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং কর্মসংস্থান বাড়বে- এই বক্তব্যে তিনি এমন একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তকে যুক্তিসংগত প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, যেটি অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ারেই পড়ে না। দেশের কৌশলগত অবকাঠামো, যেমন চট্টগ্রাম বন্দর- বিদেশি ব্যবস্থাপনায় দেওয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত, যা একটি নির্বাচিত সরকার ছাড়া অন্য কেউ নিতে পারে না। কাজেই এটি নীতিগত ও সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
তিনি জনগণের ‘স্বাস্থ্যসেবার জন্য বিদেশ যাওয়া’র সঙ্গে বন্দরের বেসরকারিকরণ তুলনা করেছেন, যা বাস্তবতা ও যৌক্তিকতার দিক থেকে ভিন্ন প্রসঙ্গ। বিদেশে ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়, কিন্তু একটি দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া জাতীয় নিরাপত্তা, কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের বিষয়। এই তুলনা বিভ্রান্তিকর এবং বাস্তব পরিস্থিতিকে আড়াল করার কৌশলমাত্র।
প্রধান উপদেষ্টা দাবি করেছেন, বিদেশি কোম্পানিগুলো অভিজ্ঞ, তারা উন্নত প্রযুক্তি আনবে এবং দেশের লোকজনকেই নিয়োগ দেবে। বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, বেসরকারিকরণ হলে প্রথমে কিছু লোক নিয়োগ দিলেও সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভরতা ও অটোমেশনের কারণে স্থানীয় নিয়োগ হ্রাস পায়। তাছাড়া চুক্তির শর্তাবলি ও মালিকানা কাঠামো যদি স্বচ্ছ না হয়, তাহলে দেশের নিরাপত্তা ও শ্রমবাজারে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অতীতে অনেক দেশেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
যে দেশ তার হৃৎপিণ্ড- অর্থাৎ চট্টগ্রাম বন্দর ভাড়া দিয়ে দেয়, সে দেশ আসলে নিজের রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থাকেই বন্ধক দেয়। সাময়িক আর্থিক লাভের জন্য যদি এই জাতীয় কৌশলগত সম্পদ বিদেশি শক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়, তাহলে তা এক ধরনের ‘নিও-কলোনিয়ালিজম’ বা আধুনিক ঔপনিবেশিকতা ডেকে আনে। এটি কোনোভাবেই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ নয়, বরং আত্মবিক্রয়ের নামান্তর। জনগণের অর্থনৈতিক স্বার্থ, কৌশলগত নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাধীনতা- এই তিনটি বিষয় একত্রে ভেবে আমাদের চলতে হবে। বাংলাদেশ কারও করুণায় নয়, নিজেদের ত্যাগ আর সাহসে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। তাই এই স্বাধীনতাকে টাকার বিনিময়ে, চুক্তির ফাঁদে বা দুরভিসন্ধিমূলক বিনিয়োগের মোড়কে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া হবে এক ভয়াবহ অপরাধ।
ধরুন, কেউ এসে বলল- আপনার হৃৎপিণ্ডটা ভাড়া নিতে চাই। বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ দেব, আধুনিক প্রযুক্তি দেব, বন্ধুত্ব দেব আজীবন- আপনি কি ভাড়া দেবেন? চট্টগ্রাম বন্দর- বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। এখান থেকেই সঞ্চালিত হয় রপ্তানি-আমদানির রক্তপ্রবাহ, প্রবাহিত হয় প্রবৃদ্ধির অক্সিজেন, বাঁচিয়ে রাখে গোটা অর্থনৈতিক দেহতন্ত্রকে। সেই হৃৎপিণ্ড কাউকে ভাড়া দেওয়া যায়? হৃৎপিণ্ড যদি ভাড়া দেন, তবে একবার ভাবুন- গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ভাড়াটে যদি রক্তপ্রবাহ আটকে দেয়, তখন আপনি বাঁচবেন কীভাবে? আর যদি সে ব্যক্তি হৃৎপিণ্ডে বিষ ঢেলে দেয়, তবে সেই বিষ তো নিমিষেই রক্তের মাধ্যমে শরীরের প্রতিটি কোষে ছড়িয়ে পড়বে। সেটি ঠেকানোর কোনো উপায় কি তখন অবশিষ্ট থাকবে? এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠবে- আপনি কি তখনও স্বাধীন? আপনি কি তখনও নিরাপদ? এই দৃষ্টিকোণ থেকেই প্রতিপক্ষরা সব সময় চাইবে আপনার হৃৎপিণ্ডটা- অর্থাৎ আপনার কৌশলগত বন্দর, অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার, দেশের মূল প্রবাহ- তাদের দখলে থাকুক। কারণ হৃৎপিণ্ড যার হাতে, শরীরের বাকি অংশ তার জন্য শুধু অনুগতই নয়, নিয়ন্ত্রিত। টাকার বিনিময়ে যদি কেউ নিজের হৃৎপিণ্ড অন্যের হাতে তুলে দেয়, তবে সে কেবল নিজের দেহ নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যৎকেই বিপন্ন করে। দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা কোনো ভাড়াটে চুক্তির বস্তু নয়। হৃৎপিণ্ড টাকার জন্য ভাড়া দেওয়া মানেই, স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎকে বন্ধক রাখা।
কথিত ‘মানবিক করিডর’-এর নামে বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের জালে জড়ানোর চক্রান্ত, চট্টগ্রামের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া এবং কাতারে সামরিক কারখানা স্থাপনের অনুমতির প্রতিবাদে ১৫ মে থেকে আজ পর্যন্ত বাম গণতান্ত্রিক জোট রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। প্রতিটি সমাবেশে নেতারা বলেছেন, ‘মানবিক করিডর’ আসলে একটি ছদ্মবেশ, যার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চলছে। এতে বাংলাদেশের জড়িয়ে পড়া জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। টার্মিনাল হস্তান্তর ও সামরিক কারখানার অনুমতি দেশের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থের বিরুদ্ধে। বন্দর, রেল ও জাতীয় সম্পদ- কোনো কিছুই আমরা বিদেশিদের দেব না।
বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও বিভিন্ন আলোচনায় ও বিবৃতিতে এই সিদ্ধান্তগুলোর বিরোধিতা করেছে এবং সরকারকে এগুলো থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।
বর্তমানে দেশে একটি অনির্বাচিত, ম্যান্ডেটহীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন এবং সংবিধানসম্মতভাবে জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকার প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই সরকার এমন কিছু কৌশলগত ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা সরাসরি দেশের জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে জড়িত।
প্রশ্ন ওঠে : এই সরকার কাদের প্রতিনিধিত্বে, কার ম্যান্ডেটে এসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে? একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জাতীয় স্বার্থে গৃহীত যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল জনগণের ভোটে নির্বাচিত, জবাবদিহিমূলক সরকারের রয়েছে। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এখতিয়ার কেবল নির্বাচন আয়োজন পর্যন্তই সীমিত থাকা উচিত। কৌশলগত চুক্তি, সামরিক শিল্প স্থাপন কিংবা বিদেশি মালিকানায় বন্দর হস্তান্তরের মতো সিদ্ধান্ত তাদের নেওয়া নৈতিক ও সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
আন্তর্জাতিক রীতিতেও এটি সুপ্রতিষ্ঠিত- অন্তর্বর্তীকালীন বা অনির্বাচিত কোনো সরকার কৌশলগত ও স্থায়ী জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না। এ ধরনের পদক্ষেপ জাতীয় স্বার্থ ও গণরায়ের প্রতি চরম অবজ্ঞা হিসেবে বিবেচিত হয়।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি স্বার্থনির্ভর সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় ফেলতে পারে। সুতরাং এখনই সময়, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন বন্ধ করুক এবং জাতীয় ভাগ্য নির্ধারণী কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকুক।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এই স্বাধীনতার অর্থ শুধু ভৌগোলিক সীমা নয়, বরং জনগণের ইচ্ছার সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা নির্ধারণের অধিকার। সেই সার্বভৌম অধিকার যেন কোনো অনির্বাচিত সরকারের পদক্ষেপে ক্ষুণ্ন না হয়, এটিই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।
শেখ রফিক : গবেষক ও কলাম লেখক
মতামত লেখকের নিজস্ব




















