সারাদেশ

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিনিয়োগের সম্ভাবনা: চীনের সিআরসিসির সঙ্গে ১৪ খাতে ইনভেস্ট বাংলাদেশের সমঝোতা

  প্রতিনিধি ৫ নভেম্বর ২০২৬ , ৬:৪১:১৮ প্রিন্ট সংস্করণ

মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দিতে এবং এলাকাটিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে বিশাল এক কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত টেক জায়ান্ট চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) সঙ্গে মেগা অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও সেবা খাতের মোট ১৪টি বিষযে একটি বহুমাত্রিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে মোংলা বন্দরে ‘মোংলা বন্দর সুবিধার সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ প্রকল্পের ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে এই সমঝোতা স্মারক সই হয়।

অনুষ্ঠানে চীনা প্রতিনিধিদলের প্রতিনিধিত্ব করেন সিআরসিসির চেয়ারম্যান দাই হেগেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা। সিআরসিসির সহযোগী প্রতিষ্ঠান চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিসিইসিসি) চেয়ারম্যান লি চংইয়াং স্ব নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনা উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন।

চিহ্নিত ১৪টি কৌশলগত বিনিয়োগ খাত:

চুক্তির আওতায় সিআরসিসি ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য সরাসরি বিনিয়োগকারী (FDI) হিসেবে কাজ করবে। প্রধান ১৪টি খাতের মধ্যে রয়েছে—

  • বাংলাদেশ-চীন মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন
  • মোংলা বন্দরের সর্বাঙ্গীন আধুনিকায়ন ও ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) নির্মাণ
  • বিশেষায়িত ফ্রেইট করিডর ও ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ
  • রোলিং স্টক সংযোজন কারখানা ও উন্নত নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন শিল্প
  • সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস স্থাপন এবং রুগ্‌ণ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে কৌশলগত বিনিয়োগ
  • বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার প্রকল্প
  • দক্ষ জনশক্তির জন্য বিশ্বমানের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রযুক্তিগত পরামর্শক সেবা।

১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ভিশন:

সরকারের নীতিগত লক্ষ্য হলো বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের শক্তিশালী অর্থনীতিতে রূপান্তর করা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এর আগে ২০২৬ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) ‘সামার ডাভোস’ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সিআরসিসি চেয়ারম্যানের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক আলোচনার সফল ধারাবাহিকতায় এই দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা চূড়ান্ত রূপ পেল।

সম্ভাবনা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ:

মেগা এই সমঝোতার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর খুলনা, মোংলা ও বাগেরহাটের ব্যবসায়ী সমাজ এবং সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকল্পগুলো দ্রুত আলোর মুখ দেখলে বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং স্থানীয় তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের দুয়ার উন্মোচিত হবে।

তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমওইউ সই হওয়া প্রাথমিক পদক্ষেপ মাত্র। এই প্রস্তাবিত বিনিয়োগগুলোকে প্রকৃত বাস্তব প্রকল্পে রূপ দিতে হলে জমি অধিগ্রহণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ, সড়ক সংযোগ উন্নয়ন ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন নিশ্চিত করাই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ। সমঝোতার আনুষ্ঠানিকতা পেরিয়ে দ্রুত দৃশ্যমান অবকাঠামোগত কাজ শুরু করাই এখন সরকারের মূল লক্ষ্য।

আরও খবর

Sponsered content