আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রক্সি বাহিনীর প্রভাব

  প্রতিনিধি ২৯ জুন ২০২৬ , ১:১৫:১৯ প্রিন্ট সংস্করণ

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শুক্রবার তাঁর সংক্ষিপ্ত মধ্যপ্রাচ্য সফর শেষ করেছেন। এ সময় তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে তাঁর আলোচনা নিয়ে বেশ ইতিবাচক ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেন। ওই নেতারা ভয় পাচ্ছেন যে ইরান পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নিজেদের ক্ষমতা ও প্রভাব বাড়ানোর যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা চুক্তিতে সেই সমস্যার কোনো সমাধান আসেনি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেন যে তারা কিছু সুনির্দিষ্ট উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তির ক্ষেত্রে তেহরানকে শুধু তাদের পরমাণু কর্মসূচিই সীমিত করলে চলবে না। একই সঙ্গে গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইরাকে সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনে হুতিদের সমর্থন দেওয়াও বন্ধ করতে হবে।

বিশ্লেষক এবং পশ্চিমা নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ধারণা, এই সংঘাতের পর এসব গোষ্ঠীর প্রতি ইরানের সমর্থন আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তেহরানের বর্তমান কৌশলগত চিন্তাভাবনা সেই ধারণার সঙ্গে মিলে যায়। তাঁরা একই সঙ্গে বলেন, যেসব অনিয়মিত যোদ্ধাকে ইসরায়েল অনেকটা এবং যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা হলেও অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছে, সামনে তাদের তৎপরতা আরও বেড়ে যেতে পারে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষে হিজবুল্লাহর ব্যাপক ক্ষতি হয়। তারপরও মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্র গোষ্ঠী ও প্রক্সি বাহিনীগুলোর প্রধান ভরসা হয়েই আছে এই হিজবুল্লাহ। তবে ইরানের জন্য এই সশস্ত্র ইসলামি সংগঠনটি তাদের প্রধান কৌশলগত দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে, আর সেটি হলো ইসরায়েলের সরাসরি হামলা ঠেকানো। এরপরও তেহরান হিজবুল্লাহর প্রতি তাদের সমর্থন ধরে রেখেছে। ৪০ বছরেরও বেশি সময় আগে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সহায়তায় লেবাননে এই গোষ্ঠীটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো হানিন গাদ্দার বলেন, ইরানিরা বর্তমান খারাপ সময়কে সাময়িক বলে মনে করছে এবং বিশ্বাস করে হিজবুল্লাহ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে। রেভোল্যুশনারি গার্ডের জন্য এই অঞ্চলে তাদের ছায়া বাহিনীগুলো পুনর্গঠন করা এবং তাদের সিদ্ধান্তগুলো নিয়ন্ত্রণ করা এখন খুবই জরুরি। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধবিরতিকে লেবাননেও যুদ্ধ বন্ধের ওপর নির্ভরশীল করে ইরান মূলত ইসরায়েল ও ওয়াশিংটনের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গেও তেহরানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তারা সাম্প্রতিক সংঘাতের শেষ দিনগুলোতে যোগ দিয়েছিল। যদিও তারা খুব একটা ক্ষতি করতে পারেনি, তবে ইসরায়েলে হামলা চালানোর এবং লোহিত সাগর দিয়ে চলা জাহাজগুলোকে হুমকি দেওয়ার ক্ষমতা ঠিকই দেখিয়েছে। তবে হুতিরা অনেকটা স্বাধীনভাবেই কাজ করে।

ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সমর্থন দিয়ে আসছে ইরান। সংঘাতের সময় তারা নিজেদের শক্তির জানান দিলেও কখনোই তাদের পুরো অস্ত্রভান্ডার ব্যবহার করেনি। এসব গোষ্ঠী ইরাকে মার্কিন সম্পদ ও কুয়েতকে লক্ষ্য করে হওয়া কয়েক ডজন ড্রোন এবং রকেট হামলার দায় স্বীকার করেছে। কিন্তু একযোগে মাঠে নামেনি। মাইকেল নাইটস বলেন, ইরান প্রত্যাশা করলেও তারা হয়তো বেশি ঝুঁকি নিতে চায় না। এছাড়া জানুয়ারিতে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠী সংগঠিত করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। উত্তর ইরাকের কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলও সফল হয়নি। সাবেক ঊর্ধ্বতন কুর্দি ও মার্কিন সেনা কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, মার্কিন বিশেষ বাহিনীর সঙ্গে কয়েক হাজার কুর্দি যোদ্ধার ইরান অভিযানের ২০ বছরের পুরোনো একটি পরিকল্পনা থাকলেও সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এই পরিকল্পনার জন্য ১২ থেকে ২৪ মাসের প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল, কিন্তু হোয়াইট হাউস ভেবেছিল এটি কিছু দিনের মধ্যেই বাস্তবায়ন সম্ভব। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের কঠোর আপত্তির কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করেন।

অন্যদিকে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সিরিয়ার একটি নতুন দ্রুজ সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সহায়তা করছে। এছাড়া গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে লড়তে ইসরায়েল একের পর এক ফিলিস্তিনি মিলিশিয়া গোষ্ঠী তৈরি করেছে। ইসরায়েল গাজার ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকা দখল করে আছে। এর বাইরের এলাকায় বাস করা ২৩ লাখ ফিলিস্তিনির ওপর নিয়ন্ত্রণ হামাসের হাতে। বিশ্লেষক মাইকেল মিলশটেইনের মতে, এসব মিলিশিয়া গোষ্ঠী কোনোভাবেই গাজার কৌশলগত অবস্থার পরিবর্তন করতে পারবে না এবং সাধারণ মানুষের কাছে তাদের বিন্দুমাত্র সমর্থন নেই। পরিশেষে, ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা কমাতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রক্সি বাহিনী ব্যবহারের প্রবণতা বরং ক্ষতিই ডেকে আনছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আরও খবর

Sponsered content