সম্পাদকীয়

ধোঁয়ায় পুড়ে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ, রাষ্ট্র কেন নির্বিকার?

  এটিএম রাকিবুল বাসার ২ জানুয়ারি ২০২৬ , ৭:৪৪:০০ প্রিন্ট সংস্করণ

আজ কিশোর ও তরুণদের হাতে যে ধোঁয়া উঠছে, তা আর নিছক একটি ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়—এটি একটি সভ্যতার জন্য স্পষ্ট অশনিসংকেত। এই ধোঁয়া আমাদের জানান দিচ্ছে, আমরা ধীরে ধীরে একটি পুরো প্রজন্মকে আত্মবিনাশের পথে ঠেলে দিচ্ছি, আর রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার সেই দৃশ্য নির্বিকারভাবে দেখে চলেছে।

ধূমপান এখন আর নির্দিষ্ট কোনো বয়স বা শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কিশোর, তরুণ, নারী-পুরুষ, এমনকি বৃদ্ধরাও এই নেশার কবলে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—তরুণ প্রজন্মের দ্রুত এই পথে জড়িয়ে পড়া। এর পেছনে কারণ খুঁজতে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে মানসিক চাপ ও সামাজিক অবহেলা। পড়াশোনার চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর হতাশা তাদের ঠেলে দেয় নেশার দিকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই যাত্রার শুরু ধূমপান দিয়ে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় বন্ধুবান্ধবের চাপ ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ভ্রান্ত ধারণা। যখন একজন কিশোর দেখে—ধূমপান করলেই সে ‘আধুনিক’ বা ‘সাহসী’ হিসেবে পরিচিত হচ্ছে, তখন তার বিবেক ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফ্লেভারযুক্ত তামাক, ই-সিগারেট ও ভ্যাপিং সেই দুর্বলতাকে আরও সহজ করে তোলে। অথচ বাস্তবতা হলো, ই-সিগারেট কোনোভাবেই নিরাপদ নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি ফুসফুসের জন্য আরও বেশি ক্ষতিকর। দুঃখজনকভাবে পরিবার ও সমাজ এই বিপদ জেনেও অনেক সময় নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকে।

সরকার সম্প্রতি পাবলিক প্লেসে ধূমপানের জরিমানা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই হাজার টাকা করেছে। কাগজে-কলমে এটি একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আইন আছে, প্রয়োগ নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, অফিস, পার্ক, পরিবহন টার্মিনাল এমনকি ভবনের আশপাশের উন্মুক্ত স্থানেও প্রকাশ্যে ধূমপান চলছেই। আইন কার্যকর না হলে তার অস্তিত্ব কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকে।

অনেকে ধূমপানকে ‘ছোট নেশা’ বলে অবহেলা করেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ধূমপান কখনো একা আসে না—এটি মাদকাসক্তির প্রবেশদ্বার। নিকোটিনের দাসত্ব ধীরে ধীরে মানুষকে আরও শক্ত নেশার দিকে ঠেলে দেয়। একবার এই চক্রে পড়লে একটি জীবন ধ্বংস হতে বেশি সময় লাগে না। স্বপ্ন ভেঙে যায়, পরিবার নিঃস্ব হয়, সমাজ হারায় একটি সম্ভাবনাময় নাগরিক।

ধূমপানের ক্ষতি শুধু স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিদিন সিগারেটের পেছনে যে অর্থ পুড়ে যায়, তা একটি পরিবারের খাদ্য, শিক্ষা কিংবা চিকিৎসার খরচ হতে পারত। এই অর্থনৈতিক চাপ পরিবারে অশান্তি বাড়ায়, হতাশা জন্ম দেয়। অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অনেক তরুণ অপরাধপ্রবণতার পথে হাঁটে—চুরি, চাঁদাবাজি কিংবা কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির জন্ম এখান থেকেই।

সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—ধূমপান একটি সামাজিক অপরাধ। একজন ধূমপায়ী কেবল নিজের ফুসফুস ধ্বংস করে না, সে আশপাশের মানুষের নিশ্বাসকেও বিষে ভরে দেয়। শিশু, নারী, বৃদ্ধ—কেউই পরোক্ষ ধূমপানের ঝুঁকি থেকে নিরাপদ নয়। এটি এক ধরনের নীরব হত্যাকাণ্ড, যার দায় কেউ নিতে চায় না।

এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা সবচেয়ে উদ্বেগজনক। ধূমপান নিয়ন্ত্রণে আইন আছে, কিন্তু নিয়মিত তদারকি ও কঠোর প্রয়োগ নেই। শুধু আইন করলেই দায় শেষ হয় না; তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, নিয়মিত অভিযান এবং সামাজিক সচেতনতা ছাড়া এই আগ্রাসী নেশা দমন সম্ভব নয়।

ধোঁয়ার এই নেশা আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—আমরা যদি এখনই থামতে না পারি, তবে আগামী প্রজন্ম সুস্থ, কর্মক্ষম ও মানবিক হবে না। একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার যুব সমাজ। সেই সম্পদ যদি ধোঁয়ায় পুড়ে যায়, তবে ভবিষ্যৎ বলে কিছু অবশিষ্ট থাকবে না।

এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার। তামাকবিরোধী সংগ্রাম মানে শুধু স্বাস্থ্য রক্ষা নয়—এটি একটি জাতিকে নেশার অন্ধকার থেকে বাঁচানোর লড়াই। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—তিন পক্ষকেই এই লড়াইয়ে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। না হলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

লিখেছেন: এটিএম রাকিবুল বাসার  ।। সম্পাদক , দৈনিক মতপ্রকাশ ।

আরও খবর

Sponsered content