মোঃ শাহ্ আলম মন্ডল, দিনাজপুর প্রতিনিধি: ১০ মার্চ ২০২৬ , ১২:০৬:৪৩ প্রিন্ট সংস্করণ
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সুফল পেতে যাচ্ছেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার হতদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ। সরকারের নতুন এই উদ্যোগকে ঘিরে সুবিধাভোগী পরিবারগুলোর মাঝে বইছে আনন্দ ও আশার আলো। বহুদিনের কষ্ট আর অনিশ্চয়তার মাঝে এই কর্মসূচিকে নতুন স্বপ্ন হিসেবে দেখছেন তারা। উদ্বোধনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে তাদের প্রত্যাশা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে সুবিধাভোগী পরিবারগুলোর তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে নবাবগঞ্জ উপজেলার একটি ওয়ার্ডের ৬০০টির বেশি নারী প্রধান পরিবার এই কর্মসূচির আওতায় আসছেন। প্রতি মাসে প্রত্যেক পরিবারকে মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।
আজ মঙ্গলবার (১০ মার্চ) আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হিসেবে এই কর্মসূচি শুরু হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রথম পর্যায়ে সারা দেশের ১৪টি উপজেলার ১৪টি ওয়ার্ড নির্বাচন করা হয়েছে। এর মধ্যে দিনাজপুর-৬ সংসদীয় আসনের নবাবগঞ্জ উপজেলার জয়পুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বেলঘাট গ্রামের হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো এই সুবিধা পাচ্ছেন। ওই ওয়ার্ডে প্রায় ২ হাজার পরিবার বসবাস করেন। এর মধ্যে যেসব পরিবারে মা বা কোনো নারী পরিবারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, সেসব পরিবারকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই এই এলাকার মানুষ নানা দিক থেকে অবহেলিত। সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকেও অনেক সময় তারা বঞ্চিত হয়েছেন। ফলে নতুন এই কর্মসূচি তাদের কাছে এক বড় আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।
কুটিরডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ারা বেগম বলেন, আমাদের এই গ্রামে আগে কোনো সরকার তেমন আসেনি, কেউ খোঁজ-খবরও নেয়নি। এখন সরকারি লোকজন এসে কাগজপত্র নিচ্ছেন। শুনেছি আমাদের ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। এই কার্ড পেলে আমাদের সংসার চালাতে অনেক উপকার হবে।
একই গ্রামের সাজেদা বেগম বলেন, আমরা খুব কষ্টে সংসার চালাই। অনেক সময় ঠিকমতো খাবার জোটে না। যদি নিয়মিত এই টাকা পাই তাহলে সন্তানদের পড়াশোনা আর খাবারের ব্যবস্থা কিছুটা হলেও ভালোভাবে করতে পারব।
শম্পা বেগম বলেন, আমরা এই অঞ্চলের অবহেলিত মানুষ। কেউ আমাদের দিকে তাকায় না। নতুন সরকার আমাদের ফ্যামিলি কার্ড দিচ্ছে শুনে আমরা খুব খুশি। এতে আমাদের পরিবারের অনেক উপকার হবে।
নবাবগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শুভ্র প্রকাশ চক্রবর্তী জানান, সুবিধাভোগীদের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একাধিক ধাপে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। প্রতিটি পরিবার থেকে একজন নারীকে নির্বাচন করা হয়েছে, যাতে নারীরা সরাসরি এই আর্থিক সহায়তা পান।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড নীতিমালা অনুযায়ী ছয় ধরনের পরিবার এই সুবিধার বাইরে থাকবে। যেসব পরিবারের কেউ সরকারি পেনশনভোগী, বাসায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) রয়েছে, ব্যক্তিগত গাড়ি বা বিলাসবহুল সম্পদের মালিক, পরিবারের কেউ সরকারি চাকরিজীবী, বাণিজ্যিক লাইসেন্সধারী বা বড় পরিসরের ব্যবসার মালিক—তারা এই সুবিধা পাবেন না।
নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান বলেন, এই কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রতি মাসে প্রত্যেক পরিবারকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে এবং তা তাদের নিজস্ব মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে প্রদান করা হবে। উদ্বোধনকে সামনে রেখে সব ধরনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ১০ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন করা হবে। আমার নির্বাচনী এলাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার একটি ওয়ার্ডের হতদরিদ্র পরিবারগুলোর কাছে এই কার্ড হস্তান্তরের মাধ্যমে কর্মসূচির যাত্রা শুরু হবে।
তিনি আরও বলেন, পর্যায়ক্রমে সারা দেশের দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। আগামী চার বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে প্রায় ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন এবং দরিদ্র পরিবারের আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
নতুন এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয়দের মতে, নিয়মিত এই সহায়তা পেলে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন কিছুটা হলেও সহজ হবে এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার পথও কিছুটা প্রশস্ত হবে।




















