প্রতিনিধি ৬ জুলাই ২০২৬ , ১:১২:৪৬ প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বকাপে ৪৮টি দল শিরোপার লড়াইয়ে নামলেও আরেকটি দল সমান কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছায় ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে। তারা হলেন ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রেফারিরা। দীর্ঘ কয়েক বছরের মূল্যায়ন, কঠোর শারীরিক পরীক্ষা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত ত্যাগের পরই বিশ্বকাপে বাঁশি বাজানোর সুযোগ পান তারা।
এবারের বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালন করছেন মোট ১৭০ জন ম্যাচ কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে রয়েছেন ৫২ জন প্রধান রেফারি, ৮৮ জন সহকারী রেফারি এবং ৩০ জন ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় রেফারি প্যানেল। ৪৮ দলের সম্প্রসারিত আসরে ম্যাচের সংখ্যাও বেড়ে হয়েছে ১০৪টি।
ফিফার ৫০টি সদস্যদেশ থেকে নির্বাচিত এই কর্মকর্তাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছেন আটজন। এছাড়া কাতার বিশ্বকাপের ধারাবাহিকতায় এবারও ছয়জন নারী রেফারি দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে এবারের বিশ্বকাপে আলোচনায় এসেছে রেফারিংয়ের বাইরের ঘটনাও। নিরাপত্তা যাচাই-সংক্রান্ত কারণে সোমালিয়ার একজন নির্বাচিত রেফারিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে উদ্বোধনী ম্যাচেই দেখানো হয়েছে রেকর্ড তিনটি লাল কার্ড। আবার চীনের জাতীয় দল বিশ্বকাপে জায়গা না পেলেও দেশটির একমাত্র প্রতিনিধি রেফারিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমর্থন দেখা গেছে।
বিশ্বকাপে আসার পথ শুরু হয় চার বছর আগে
ফিফা জানিয়েছে, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরপরই শুরু হয় এবারের রেফারি বাছাই প্রক্রিয়া।
প্রার্থীদের নিয়মিত সেমিনারে অংশ নিতে হয়েছে, দিতে হয়েছে ফিটনেস পরীক্ষা এবং থাকতে হয়েছে ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্ট পরিচালনার অভিজ্ঞতা। গত তিন বছরে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ম্যাচে তাদের পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণ করার পর চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হয়।
২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালসহ চারটি ম্যাচ পরিচালনা করা সাবেক ইতালিয়ান সহকারী রেফারি রেনাতো ফাভেরানি জানান, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পর্যবেক্ষক থাকেন। ম্যাচ শেষে প্রতিটি রেফারি দলের বিস্তারিত মূল্যায়ন করা হয় এবং অন্য দলগুলোর সঙ্গে তুলনা করে তাদের মান নির্ধারণ করা হয়।
নকআউটে নিয়োগ নির্ভর করে পারফরম্যান্সের ওপর
বিশ্বকাপে নির্বাচিত হওয়াই শেষ নয়। টুর্নামেন্ট চলাকালে প্রতিটি ম্যাচের তিন থেকে চার দিন আগে পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে নতুন করে দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নিজ দেশের ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ পান না কোনো রেফারি, যাতে নিরপেক্ষতা বজায় থাকে।
২০০২ বিশ্বকাপের ফাইনালে দায়িত্ব পালন করা সুইডেনের সাবেক সহকারী রেফারি লেইফ লিন্ডবার্গ বলেন, একপর্যায়ে তিনি নিজের দেশের পরাজয়ও কামনা করেছিলেন, কারণ সুইডেন সেমিফাইনালে উঠলে তাকেও টুর্নামেন্ট ছেড়ে ফিরতে হতো।
ফাইনালের দায়িত্ব পাওয়ার মুহূর্ত
বিশ্বকাপ ফাইনালের দায়িত্ব পাওয়ার অভিজ্ঞতাকে জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত বলে বর্ণনা করেন ফাভেরানি।
তিনি জানান, অনুশীলন শেষে একদিন সব রেফারিকে একটি হলে ডাকা হয়। এরপর তৎকালীন ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটার একটি কাগজ খুলে ফাইনালের রেফারিদের নাম ঘোষণা করেন। নিজের নাম শোনার পর আনন্দের পাশাপাশি শুরু হয় তীব্র চাপ ও দায়িত্ববোধ।
ম্যাচের আগেই শুরু হয় প্রস্তুতি
বিশ্বকাপে একটি ম্যাচ পরিচালনার জন্য শুধু খেলার নিয়ম জানাই যথেষ্ট নয়। প্রতিদিনের শারীরিক অনুশীলনের পাশাপাশি রেফারিদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও বিশ্লেষণ করতে হয়।
ফাভেরানি জানান, তিনি ম্যাচের আগে সংশ্লিষ্ট দুই দলের আগের ম্যাচগুলো দেখতেন, খেলোয়াড়দের স্বভাব, আক্রমণের ধরণ ও রক্ষণ কৌশল বিশ্লেষণ করতেন। এমনকি যেসব রেফারি আগে ওই দলগুলোর ম্যাচ পরিচালনা করেছেন, তাদের কাছ থেকেও পরামর্শ নিতেন।
তার মতে, কোন খেলোয়াড় সংঘর্ষে জড়ানোর প্রবণতা রাখেন বা কোন পরিস্থিতিতে উত্তেজনা বাড়তে পারে, তা জানা থাকলে মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
পরিবারের সঙ্গে সময় হারানোর মূল্য
বিশ্বকাপের মঞ্চে ওঠার জন্য অনেক রেফারিকেই ব্যক্তিগত জীবনে বড় মূল্য দিতে হয়।
লিন্ডবার্গ বলেন, অধিকাংশ রেফারির অন্তত একটি বিবাহবিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর বদলে বছরের পর বছর অনুশীলন ও ম্যাচ পরিচালনায় ব্যস্ত থাকতে হয়।
ফাভেরানিও জানান, তিনি পূর্ণকালীন চাকরির পাশাপাশি সপ্তাহের মাঝামাঝি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং সপ্তাহান্তে সিরি আ’র ম্যাচ পরিচালনা করতেন। অফিসের কাজও ফোন ও ই-মেইলের মাধ্যমে চালিয়ে যেতে হতো।
তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, এখন বুঝতে পারেন, রেফারিংয়ের জন্য তিনি স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের কাছ থেকে কতটা সময় কেড়ে নিয়েছিলেন।
প্রযুক্তির যুগে বাড়ছে চাপ
ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) চালু হওয়ার পর রেফারিদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত আরও বেশি নজরদারির মধ্যে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা ও অপমানও বেড়েছে।
রেফারি অ্যাব্রড সংস্থার সভাপতি দানিয়েলে কুরচিও বলেন, রেফারিদের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে, যা নতুন প্রজন্মকে এই পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত করছে।
তার ভাষায়, ‘রেফারিরাও ভুল করতে পারেন, যেমন একজন খেলোয়াড় পেনাল্টি মিস করতে পারেন। কিন্তু তাদের সততা ও দায়িত্ববোধের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে।’
বিশ্বকাপের আলো ঝলমলে মঞ্চে খেলোয়াড়রাই সবচেয়ে বেশি নজর কাড়েন। তবে সেই মঞ্চকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং ব্যক্তিগত ত্যাগের মধ্য দিয়েই নিজেদের প্রস্তুত করেন রেফারিরা। তাদের সেই অদেখা সংগ্রামই ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের আরেকটি নীরব গল্প।















