প্রতিনিধি ৬ জুলাই ২০২৬ , ১২:১৫:৪৪ প্রিন্ট সংস্করণ
গীবত বা পরনিন্দা ইসলামে কবিরা গুনাহ হিসেবে বিবেচিত। কোনো অবস্থাতেই গীবত বৈধ নয় সামনেই হোক বা কারও অনুপস্থিতিতে। তবে কারও অনুপস্থিতিতে তার দোষ-ত্রুটি আলোচনা করা আরও মারাত্মক অপরাধ। কারণ সে উপস্থিত না থাকায় নিজের পক্ষে ব্যাখ্যা দেওয়ার বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পায় না। ফলে তার সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে, তা সত্য নাকি মিথ্যা তা যাচাই করারও কোনো উপায় থাকে না।
গীবত করা যেমন পাপ, তেমনি গীবতের আসরে বসে তা মনোযোগ দিয়ে শোনা কিংবা এতে উৎসাহ দেওয়াও গুনাহের কাজ। কেউ যদি কারও গীবত শুরু করে, তাহলে একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো তাকে বিনয়ের সঙ্গে বিরত রাখার চেষ্টা করা। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে সেই স্থান ত্যাগ করা উচিত। সমাজের প্রতিটি মানুষ যদি এ বিষয়ে সচেতন হয়, তবে গীবতের মতো মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি অনেকটাই কমে আসবে।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন,‘আমার প্রতিপালক যখন আমাকে মিরাজে নিয়ে গেলেন, তখন আমি এমন একদল মানুষের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম, যাদের নখ ছিল তামার নখের মতো। তারা সেই নখ দিয়ে নিজেদের মুখমণ্ডল ও বুক আঁচড়াচ্ছিল। আমি জিবরাইল (আলাইহিস সালাম)-কে জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা সেই লোক, যারা দুনিয়ায় মানুষের গোশত খেত এবং তাদের সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলত।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ)
এখানে ‘মানুষের গোশত খাওয়া’ বলতে গীবত করাকেই বোঝানো হয়েছে। তাই একজন মুসলিমের উচিত সচেতনভাবে নিজের জিহ্বার হেফাজত করা এবং গীবত থেকে দূরে থাকা।
গীবতের অপরাধ থেকে মুক্তি লাভের উপায়
চিন্তা ভাবনা করে কথা বলা
কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে এমন কোনো কথা বলবেন না, যা তিনি শুনলে কষ্ট পাবেন। কথা বলার আগে নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করুন আমি যা বলছি, তা কি সত্য? এটি বলা কি সত্যিই প্রয়োজন? এতে কোনো উপকার হবে, নাকি শুধু কারও সম্মানহানি হবে? যদি এসব প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর না পান, তবে নীরব থাকাই উত্তম। অনেক সময় একটি কথাই মানুষের সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে।
অপ্রয়োজনীয় আড্ডা ও পরচর্চা এড়িয়ে চলা
গীবতের অন্যতম বড় কারণ হলো উদ্দেশ্যহীন আড্ডা। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প, অফিসের বিরতি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন আলোচনায় অজান্তেই পরনিন্দা শুরু হয়ে যায়। তাই এমন আড্ডা থেকে দূরে থাকুন, যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, ভুল বা দুর্বলতা নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। অবসর সময়কে কোরআন তিলাওয়াত, ইসলামি বই পড়া, নতুন কিছু শেখা কিংবা পরিবারকে সময় দেওয়ার মতো উপকারী কাজে ব্যয় করুন।
গীবতের আসর থেকে নিজেকে সরিয়ে আনা
কোনো বৈঠক, অফিস বা পারিবারিক আড্ডায় যদি কারও গীবত শুরু হয়, তাহলে প্রথমে ভদ্রভাবে বিষয় পরিবর্তনের চেষ্টা করুন। বলতে পারেন, ‘চলুন অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলি।’ যদি তাতেও কাজ না হয় এবং গীবত চলতেই থাকে, তাহলে সেখান থেকে উঠে যাওয়াই উত্তম। কারণ গীবতের আসরে নীরব শ্রোতা হয়ে বসে থাকাও অনুচিত।
নিজের দোষ-ত্রুটি সংশোধনে মনোযোগ দেওয়া
মানুষ সাধারণত অন্যের ভুল খুঁজতে বেশি আগ্রহী, কিন্তু নিজের ভুলগুলো দেখতে চায় না। অথচ একজন মুমিনের উচিত প্রতিদিন নিজের কাজের হিসাব নেওয়া। নিজের চরিত্র, আমল ও আচরণ সংশোধনের চেষ্টা করলে অন্যের সমালোচনা করার প্রবণতা অনেকটাই কমে যায়। মনে রাখবেন, প্রত্যেক মানুষই ভুল করে এবং আল্লাহই সর্বোত্তম বিচারক।
আল্লাহর কাছে জবাবদিহির কথা স্মরণ রাখা
প্রত্যেক কথারই হিসাব দিতে হবে। কিয়ামতের দিন মানুষের জিহ্বা দিয়ে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দের জবাবদিহি করতে হবে, এই বিশ্বাস হৃদয়ে দৃঢ় থাকলে গীবত থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়। কোনো কথা বলার আগে ভাবুন, এই কথার জন্য যদি আজই আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হয়, তাহলে কি আমি এর জবাব দিতে পারব?
জিকির, কোরআন তিলাওয়াত ও উপকারী কাজে সময় ব্যয় করা
অবসর সময় যদি ভালো কাজে ব্যয় করা হয়, তাহলে গীবতের সুযোগ অনেক কমে যায়। নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া, ইসলামি জ্ঞান অর্জন এবং সমাজসেবামূলক কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। যে জিহ্বা আল্লাহর জিকিরে ব্যস্ত থাকে, সে জিহ্বা গীবতে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনাও কম থাকে।
ভুল হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তওবা করা
মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কখনো অসাবধানতাবশত গীবত হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকার দৃঢ় সংকল্প করুন। যার সম্পর্কে গীবত করেছেন, তার জন্য দোয়া করুন এবং সুযোগ থাকলে তার প্রতি ভালো আচরণ করুন। এতে অন্তরও পরিশুদ্ধ হবে এবং গুনাহ থেকে ফিরে আসার আন্তরিকতা প্রকাশ পাবে।
গীবতের ক্ষতিকর প্রভাব
গীবত শুধু একটি ব্যক্তিগত গুনাহ নয়; এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। গীবতের কারণে, মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়। আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বের সম্পর্কে ফাটল ধরে। সমাজে হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভেদ সৃষ্টি হয়। মানুষের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়। আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও আখিরাতে শাস্তির কারণ হতে পারে। তাই ইসলামের শিক্ষা হলো, উপকারী কথা বলো, অন্যথায় নীরব থাকো। নিজের জিহ্বার হেফাজত করা একজন মুমিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
পরিশেষে, আল্লাহ তাআলার কাছে আমাদের প্রার্থনা তিনি যেন মুসলিম উম্মাহকে গীবত ও পরনিন্দার মতো মারাত্মক গুনাহ থেকে হেফাজত করেন। আমাদের জিহ্বাকে সত্য ও কল্যাণকর কথায় অভ্যস্ত করে দেন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা দান করেন। আমিন।















