প্রতিনিধি ৪ জুলাই ২০২৬ , ১১:১১:৪৭ প্রিন্ট সংস্করণ
ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তান শুধু পারিবারিক আনন্দের উৎস নয়, বরং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে দেওয়া এক মহামূল্যবান নিয়ামত ও গুরুত্বপূর্ণ আমানত। কোরআনে সন্তানকে মানুষের জন্য দুনিয়ার সৌন্দর্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে এটিও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, সন্তান মানুষের জন্য একটি পরীক্ষা। তাই তাদের শুধু ভরণ-পোষণ বা পার্থিব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; বরং ঈমান, নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী গড়ে তোলার দায়িত্বও বাবা-মায়ের ওপর ন্যস্ত। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জেনে রেখো! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল; আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। (বুখারি ৭১৩৮)
আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার আগে কোরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনায় সন্তান-সন্তুতিদের লালন-পালন করা জরুরি। তাই নিজ নিজ সন্তানদের কোরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনায় এভাবে গড়ে তুলতে হবে।
সন্তান লালন-পালনে ইসলামের দিকনির্দেশনা
সন্তানকে আল্লাহর নিয়ামত ও আমানত মনে করা
ইসলাম সন্তান লালন-পালনকে ইবাদতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। একজন অভিভাবকের দায়িত্ব হলো সন্তানের হালাল উপার্জনে ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা, ভালো শিক্ষা দেওয়া, সত্যবাদিতা, সততা, শালীনতা, দয়া, ধৈর্য ও অন্যের অধিকার রক্ষার মতো গুণাবলি শেখানো। একই সঙ্গে তাদের এমন পরিবেশে বড় করে তোলা, যেখানে তারা ইসলামের মৌলিক বিধান, নৈতিক আচরণ ও সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে পারে।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের শোভা।’(সূরা আল-কাহফ, আয়াত ৪৬)। আবার তিনি মুমিনদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।’ (সূরা আত-তাহরিম, আয়াত ৬)। এই নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, সন্তানের শুধু দুনিয়াবি সফলতা নয়, আখিরাতের কল্যাণের বিষয়েও বাবা-মায়ের দায়িত্ব রয়েছে। তাই সন্তানের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি তাকে সঠিক পথের দিকনির্দেশনা দেওয়া, উত্তম চরিত্রে গড়ে তোলা এবং তার জন্য নিয়মিত দোয়া করা একজন মুসলিম অভিভাবকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।
সন্তানকে সতর্ক করা
জীবন সম্পর্কে সন্তানদের অভিজ্ঞতা কম।তাই মা-বাবার উচিত, তাদের কঠিন এই পৃথিবী সম্পর্কে সতর্ক করা, যে পথে বিপদের আশঙ্কা আছে, সে পথ এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেওয়া। যেভাব হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে তার বাবা এভাবে সতর্ক করেছিলেন-
قَالَ یٰبُنَیَّ لَا تَقۡصُصۡ رُءۡیَاکَ عَلٰۤی اِخۡوَتِکَ فَیَکِیۡدُوۡا لَکَ کَیۡدًا ؕ اِنَّ الشَّیۡطٰنَ لِلۡاِنۡسَانِ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ
তার পিতা বললেন, ‘হে আমার পুত্র! তোমার স্বপ্নের কথা তোমার ভাইদের কাছে বর্ণনা কোরো না। যদি করো তাহলে তারা তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করবে। শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। ’ (সুরা ইউসুফ : আয়াত ৫)
নামাজ ও ইবাদতে অভ্যস্ত করা
ইসলামে সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত এবং ইসলামের মৌলিক বিধান সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শৈশবেই ইবাদতের অভ্যাস গড়ে উঠলে তা পরবর্তী জীবনে ঈমান, তাকওয়া, শৃঙ্খলাবোধ ও নৈতিক চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সন্তানকে জোর-জবরদস্তির পরিবর্তে ভালোবাসা, উৎসাহ এবং নিজের আমলের মাধ্যমে নামাজ ও ইবাদতের প্রতি আগ্রহী করে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
কোরআনে আল-কুরআন-এ সূরা ত্বা-হা-এর ১৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,‘তুমি তোমার পরিবারকে নামাজের নির্দেশ দাও এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থাকো।’ এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে সন্তানদের নামাজে অভ্যস্ত করার দায়িত্ব অভিভাবকের ওপর বর্তায়।
এ ছাড়া সূরা লোকমান-এ লোকমান (আ.) তার সন্তানকে উপদেশ দিয়ে বলেন, ‘হে আমার প্রিয় পুত্র! নামাজ কায়েম করো, সৎকাজের নির্দেশ দাও, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করো এবং তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধারণ করো।’ (আয়াত ১৭)। এই আয়াতে শুধু নামাজ নয়, বরং একজন আদর্শ মুসলিমের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বের শিক্ষাও তুলে ধরা হয়েছে।
তাই সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই নামাজ, কোরআন শিক্ষা, দোয়া এবং ইসলামের মৌলিক আদর্শের সঙ্গে পরিচিত করানো অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পারিবারিক পরিবেশে নিয়মিত জামাতে নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত এবং ইসলামী মূল্যবোধের চর্চা সন্তানকে দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্বশীল মানসিকতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
শিরক না করার নির্দেশ দেওয়া
আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শিরক না করার ব্যাপারে ছেলেকে দেওয়া হজরত লুকমান আলাইহিস সালামের উপদেশ আল্লাহ তাআলা কোরআনুল কারিমে উল্লেখ করেন এভাবে-
وَ اِذۡ قَالَ لُقۡمٰنُ لِابۡنِهٖ وَ هُوَ یَعِظُهٗ یٰبُنَیَّ لَا تُشۡرِکۡ بِاللّٰهِ ؕ اِنَّ الشِّرۡکَ لَظُلۡمٌ عَظِیۡمٌ
‘স্মরণ কর, যখন লুকমান তার ছেলেকে নসিহত করে বলেছিল—হে বৎস! আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে শিরক কোরো না, শিরক হচ্ছে অবশ্যই বিরাট জুলুম।’ (সুরা লোকমান : আয়াত ১৩)
মা-বাবার খেদমতের শিক্ষা দেওয়া
মা-বাবা খেদমত করা মহান আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহ তাআলা কোরআনে পাকে ইরশাদ করেন-
وَ وَصَّیۡنَا الۡاِنۡسَانَ بِوَالِدَیۡهِ ۚ حَمَلَتۡهُ اُمُّهٗ وَهۡنًا عَلٰی وَهۡنٍ وَّ فِصٰلُهٗ فِیۡ عَامَیۡنِ اَنِ اشۡکُرۡ لِیۡ وَ لِوَالِدَیۡکَ ؕ اِلَیَّ الۡمَصِیۡرُ وَ اِنۡ جَاهَدٰکَ عَلٰۤی اَنۡ تُشۡرِکَ بِیۡ مَا لَیۡسَ لَکَ بِهٖ عِلۡمٌ ۙ فَلَا تُطِعۡهُمَا وَ صَاحِبۡهُمَا فِی الدُّنۡیَا مَعۡرُوۡفًا ۫ وَّ اتَّبِعۡ سَبِیۡلَ مَنۡ اَنَابَ اِلَیَّ ۚ ثُمَّ اِلَیَّ مَرۡجِعُکُمۡ فَاُنَبِّئُکُمۡ بِمَا کُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ
‘আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করে। তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে, (নির্দেশ দিচ্ছি) যে আমার প্রতি ও তোমার পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। (তোমাদের সবার) প্রত্যাবর্তন তো আমারই কাছে। তোমার পিতামাতা যদি তোমাকে পীড়াপীড়ি করে আমার অংশীদার স্থির করার জন্য, যার জ্ঞান তোমার নেই, তবে তুমি তাদের কথা মানবে না। কিন্তু পৃথিবীতে তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করবে। যে আমার অভিমুখী হয় তার পথ অনুসরণ করবে। অতঃপর আমারই কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তখন আমি তোমাদের জানিয়ে দেব তোমরা যা করছিলে। ’ (সুরা লোকমান : আয়াত ১৪-১৫)
অহংকার থেকে দূরে রাখা
আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার প্রতিটি মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত স্বরূপ সুরা লুকমান নাজিল করেছেন। হজরত লুকমান আলাইহিস সালাম নিজ সন্তানতে দুনিয়াতে বেড়ে ওঠার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। অহংকার ও দাম্ভিকতা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন এভাবে-
وَ لَا تُصَعِّرۡ خَدَّکَ لِلنَّاسِ وَ لَا تَمۡشِ فِی الۡاَرۡضِ مَرَحًا ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا یُحِبُّ کُلَّ مُخۡتَالٍ فَخُوۡرٍ
‘অহংকারের বশবর্তী হয়ে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা কোরো না, আর পৃথিবীতে গর্বভরে চলাফেরা কোরো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না। ’ (সুরা : লোকমান, আয়াত : ১৮)।
জীবনযাপনে সংযত হওয়ার নির্দেশ
দুনিয়ার জীবনে চলাফেরায় সংযত হওয়ার নির্দেশও এসেছে কোরআনের বর্ণনায়। হজরত লুকমান আলাইহিস সালাম নিজ ছেলেকে এ মর্মে নির্দেশ দিচ্ছেন-
وَ اقۡصِدۡ فِیۡ مَشۡیِکَ وَ اغۡضُضۡ مِنۡ صَوۡتِکَ ؕ اِنَّ اَنۡکَرَ الۡاَصۡوَاتِ لَصَوۡتُ الۡحَمِیۡرِ
‘চলাফেরায় সংযত ভাব অবলম্বন করো এবং কণ্ঠস্বর নিচু করো। স্বরের মধ্যে নিশ্চয়ই গাধার স্বর সর্বাপেক্ষা শ্রুতিকটু।’ (সুরা লুকমান : আয়াত ১৯)
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে নিজ নিজ সন্তানদের কোরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনা দেওয়ার তাওফিক দান করুন। সন্তানদের সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
উত্তম আদর্শ স্থাপন করা
সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, শালীনতা, বিনয়, ধৈর্য, দয়া, ক্ষমাশীলতা, বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান, ছোটদের স্নেহ, সময়ানুবর্তিতা এবং অন্যের অধিকার রক্ষার শিক্ষা দিতে হবে। তবে এসব শিক্ষা শুধু কথায় নয়, বাবা-মায়ের দৈনন্দিন আচরণ ও জীবনাচরণের মাধ্যমেই সন্তান সবচেয়ে বেশি শেখে। তাই সন্তানের সামনে এমন আচরণ করা উচিত, যা তাকে একজন সৎ, দায়িত্বশীল ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে অনুপ্রাণিত করে।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ এই হাদিসে পরিবার ও সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্বের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তানকে সুশিক্ষা, উত্তম চরিত্র, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলিতে গড়ে তোলা ইবাদতেরই একটি অংশ। বাবা-মায়ের আন্তরিক প্রচেষ্টা, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং নিয়মিত দোয়ার মাধ্যমে সন্তান একজন আদর্শ ও কল্যাণকর মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।















