প্রতিনিধি ৩০ অক্টোবর ২০২৬ , ১১:১২:৪২ প্রিন্ট সংস্করণ
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দেশটিতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাসও সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থা চলতে পারে। পরিস্থিতির সমাধান না হলে দেশটিতে আবারও জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন বার্তাসংস্থা সিএনএন।
ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট কোনোটিই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।
রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভাজন গভীর হওয়ায় নতুন সরকার গঠনের পথ বেশ জটিল হয়ে উঠেছে। তবে কয়েকটি সম্ভাব্য সমীকরণের মাধ্যমে সরকার গঠনের চেষ্টা চালানো হতে পারে। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দলগুলোর হাতে প্রায় ১২ সপ্তাহ সময় থাকবে। এর মধ্যে সমঝোতা না হলে আবারও ভোটের মুখোমুখি হতে হবে ইসরায়েলিদের।
আরব দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠনের সম্ভাবনা
নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ক্ষেত্রে বিরোধী জোটের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পথ হতে পারে ইহুদি ও আরব দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা। তবে এ পথেই রয়েছে বড় রাজনৈতিক বাধা।
বিরোধী জোটের ডানপন্থী দুই নেতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যান, আরব দলগুলোর সমর্থনে কোনো সরকার গঠনের বিরোধী। পার্লামেন্টের দুই আরব দল জয়েন্ট লিস্ট ও রাআম সরকারে সরাসরি অংশ নিক কিংবা বাইরে থেকে সংখ্যালঘু সরকারকে সমর্থন করুক কোনোভাবেই তারা তা মেনে নিতে রাজি নন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর তাদের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।
ইসরায়েলের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মাত্র একবার কোনো আরব দল সরাসরি সরকারে অংশ নিয়েছে। ২০২১ সালে রাআমসহ আটটি দলের জোট নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সক্ষম হয়েছিল। তবে সেই সরকার এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই ভেঙে পড়ে।
জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের উদ্যোগ
আরেকটি সম্ভাবনা হলো দুই রাজনৈতিক জোটের ভাঙন ঘটিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন। এ ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং তার বর্তমান জোটের কয়েকটি দল অংশ নিতে পারে। পাশাপাশি বিরোধী জোটের অন্তত একটি দলকেও এতে যুক্ত হতে হবে।
ধারণা করা হচ্ছে, এ ধরনের সমঝোতার জন্য নেতানিয়াহু তার উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরকে বাদ দিতে রাজি হতে পারেন। তবে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোৎরিচ এবং অতি-রক্ষণশীল দলগুলোকে ছাড়তে তিনি আগ্রহী নন।
অন্যদিকে, আইজেনকোট আগেই নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরকার গঠনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তার অবস্থান পরিবর্তন করলে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আগ্রহী অনেক ইসরায়েলি সেটিকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখতে পারেন।
বিরোধী দল থেকে সদস্য ভাঙানোর চেষ্টা
সরকার গঠনের আরেকটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে বিরোধী জোটের দল বা ব্যক্তিগত সংসদ সদস্যদের নিজেদের পক্ষে টেনে নেওয়া। তবে এ পথও নেতানিয়াহুর জন্য সহজ নয়।
বিরোধী জোটের চার নেতা- গাদি আইজেনকোট, নাফতালি বেনেট, আভিগদর লিবারম্যান ও ইয়াইর গোলান নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরকার গঠনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য নেতানিয়াহুর জোটকে আরও আটটি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে আটজন সংসদ সদস্যকে দলত্যাগে রাজি করানো কঠিন হতে পারে।
সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন প্রেসিডেন্ট
এসব রাজনৈতিক সমীকরণের পাশাপাশি ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ পার্লামেন্টে আসন পাওয়া দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করবেন। তাদের মতামত নেওয়ার পর তিনি একজন নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন।
ধারণা করা হচ্ছে, আরব দলগুলো আইজেনকোটের প্রতি সমর্থন জানাতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রথমে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেতে পারেন ইয়াশার নেতা।
প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে দায়িত্ব পাওয়ার পর সরকার গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট নেতা ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রথম ব্যক্তি ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় একজন নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। তার জন্য সময় থাকবে ২৮ দিন।
দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হলে নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা প্রেসিডেন্টকে তৃতীয় একজন প্রার্থীকে দায়িত্ব দেওয়ার অনুরোধ করতে পারবেন। ওই প্রার্থী জোট গঠনের জন্য ১৪ দিন সময় পাবেন। তিনটি প্রচেষ্টার কোনোটিই সফল না হলে আবারও জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে।
রাজনৈতিক অচলাবস্থায় সুবিধাজনক অবস্থানে নেতানিয়াহু
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন নেতানিয়াহু। তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তার দায়িত্বে থাকার সুযোগ রয়েছে।
আইজেনকোট প্রথমে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেয়ে ব্যর্থ হলে সেই দায়িত্ব নেতানিয়াহুর হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনিও ব্যর্থ হলে দেশটির রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুই তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।





















