জাতীয়

ফেলানী হত্যাকাণ্ডের ১৫ বছর: ন্যায় বিচারের অপেক্ষায় আজও সীমান্তবাসী ও পরিবার

  মোঃ কামরুল হাসান কাজল, ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি ৭ জানুয়ারি ২০২৬ , ৬:২৪:৩৬ প্রিন্ট সংস্করণ

কুড়িগ্রাম সীমান্তে আলোচিত কিশোরী ফেলানী খাতুন হত্যাকাণ্ডের ১৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। আজ বুধবার (৭ জানুয়ারি) দিনটি এলেই বুকভরা বেদনা আর ন্যায় বিচারের প্রত্যাশায় দিন কাটে ফেলানীর বাবা-মা ও সীমান্ত এলাকার মানুষের।

দেশ-বিদেশে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো ভারতের উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকায় হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন সীমান্তবাসী ও আইন বিশেষজ্ঞরা।

জানা গেছে, ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে বাবার সঙ্গে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সময় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর সদস্য অমিয় ঘোষের গুলিতে প্রাণ হারায় ফেলানী খাতুন। দীর্ঘ সময় কাঁটাতারের ওপর ঝুলে থাকা ফেলানীর মরদেহের ছবি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার ঝড় ওঠে।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে বিএসএফের বিশেষ আদালতে ফেলানী হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়। তবে দু’দফা বিচারে অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।

এরপর ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন মাসুম-এর সহায়তায় ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম ভারতের উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দাখিল করেন। একাধিকবার শুনানির তারিখ নির্ধারিত হলেও এখনো বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়নি। ফলে দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ন্যায় বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছেন পরিবারটি।

ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, “প্রতি বছর ৭ জানুয়ারি এলেই বুক ফেটে কান্না আসে। আমার মেয়ের হত্যার ন্যায় বিচার হলে তবেই তার আত্মা শান্তি পাবে। আমি হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম বলেন, “১৫ বছর পার হয়ে গেল, এখনও বিচার পেলাম না। কয়েকবার ভারতে গিয়ে সাক্ষ্য দিয়েছি, উচ্চ আদালতে রিটও করেছি। তবুও শুধু আশায় আছি—একদিন ন্যায় বিচার পাবো।”

নিহত ফেলানীর প্রতিবেশী মফিজুল ইসলাম বলেন, “ফেলানী হত্যার বিচার হলে সীমান্তে আর এমন নির্মম ঘটনা ঘটবে না। এই বিচার সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে বড় দৃষ্টান্ত হবে।”

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারতের উচ্চ আদালতে বিচার সম্পন্ন ও দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে হত্যাকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। কুড়িগ্রামের সিনিয়র আইনজীবী ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ফখরুল ইসলাম বলেন, “ফেলানী হত্যার বিচার হলে বিএসএফ সদস্যরা ভবিষ্যতে এমন অপরাধ করতে সাহস পাবে না। এটি সীমান্ত হত্যা বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।”

উল্লেখ্য, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলনিটারী গ্রামের নুর ইসলাম ও জাহানারা দম্পতির ছয় সন্তানের মধ্যে ফেলানী ছিল সবার বড়। অভাবের তাড়নায় কাজের সন্ধানে তারা ভারতে গিয়েছিলেন। পরে ফেলানীকে বিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে দালালের মাধ্যমে দেশে ফেরার সময় এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় কিশোরী ফেলানী খাতুন।

১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও ফেলানীর নাম উচ্চারিত হলে নীরব হয়ে যায় সীমান্তের আকাশ-বাতাস—আর ন্যায় বিচারের অপেক্ষায় ভিজে ওঠে একটি অসহায় পরিবারের চোখ।

আরও খবর

Sponsered content