মোহাম্মদ হোসাইন, স্টাফ রিপোর্টার ৮ নভেম্বর ২০২৬ , ১২:৩৭:৫০ প্রিন্ট সংস্করণ
কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার পাহাড়ঘেরা জনপদ একসময় ছিল প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আর মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম আশ্রয়স্থল। পাহাড়ের ঢালে জুমচাষ, পাদদেশে শাকসবজির আবাদ, গবাদিপশু পালন এবং নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন অসংখ্য মানুষ। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চিরচেনা পাহাড়ের দৃশ্যপট যেন পাল্টে গেছে। যে পাহাড় একসময় মানুষের জীবিকার অবলম্বন ছিল, আজ সেখানে বিরাজ করছে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা।
পাহাড়ের গহিনে অপহরণ, মানবপাচার ও সশস্ত্র অপরাধী চক্রের তৎপরতার অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। জীবিকার প্রয়োজনে পাহাড়ে যাওয়া কৃষক, রাখাল ও শ্রমজীবী মানুষ এখন নিরাপত্তার কথা ভেবে শঙ্কিত। প্রশ্ন উঠেছে—প্রকৃতির আশীর্বাদে গড়ে ওঠা এই জনপদে মানুষ কবে ফিরে পাবে নিরাপদে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা?
একটু অতীতের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, টেকনাফের পাহাড়ি জনপদের মানুষের জীবন ছিল প্রকৃতিনির্ভর। পাহাড়ের ঢালে জুমচাষ, পাদদেশে মৌসুমি শাকসবজির আবাদ, গরু-মহিষ-ছাগল পালন এবং নদী ও সমুদ্রে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
কৃষকের ঘরে উঠত বছরের খাদ্য, গোয়ালভরা গবাদিপশু ছিল অনেক পরিবারের সম্পদ। পাহাড়ের সবুজ ঘাসে গরু-মহিষ চরে বেড়াত, মাঠে ফলত নানা ধরনের ফসল। অভাব ও সংগ্রাম থাকলেও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের ছিল নিবিড় সম্পর্ক।
পাহাড় তখন শুধু মাটি-পাথরের স্তূপ ছিল না; পাহাড় ছিল কৃষকের স্বপ্ন, রাখালের জীবিকা, পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পদ গড়ে তোলার অন্যতম অবলম্বন।
অথচ আজ সেই পাহাড়ে জীবিকার প্রয়োজনে যেতে হলেও মানুষকে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। একজন কৃষককে জমিতে যেতে ভয় পেতে হচ্ছে, একজন রাখালকে গবাদিপশু চরাতে গিয়ে অপহরণের আশঙ্কা করতে হচ্ছে। এর চেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা আর কী হতে পারে?
গত ৫ নভেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের মোচনী নয়াপাড়া রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন গহিন পাহাড়ে অপহৃত ব্যক্তিদের উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর অভিযানকে কেন্দ্র করে ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা।
সেনাবাহিনী, বিজিবি, এসআরবি ও পুলিশের সদস্যদের অংশগ্রহণে পরিচালিত অভিযানের একপর্যায়ে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের গুলিবিনিময় হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হন এক সেনাসদস্য। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁর মৃত্যু হয়।
একজন সেনাসদস্যের মৃত্যু মানে একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া, স্বজনদের জীবনে গভীর শূন্যতা তৈরি হওয়া। দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর এমন মৃত্যু আমাদের ব্যথিত করে।
কোনো মা হয়তো সন্তানের ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন। কোনো পরিবারের কাছে তিনি ছিলেন আশার আলো, কোনো স্বজনের কাছে নির্ভরতার নাম। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁর প্রাণ হারানোর ঘটনায় পরিবারের বেদনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই অভিযানে প্রায় ৫৭ জন অপহৃত ব্যক্তিকে উদ্ধার এবং দুজন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। এই উদ্ধার স্বজনদের জন্য স্বস্তির খবর হলেও একই সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় অপহরণ ও মানবপাচারের ভয়াবহ বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
একজন সেনাসদস্যের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি প্রশ্ন উঠছে—কেন দুর্গম পাহাড়ে অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জীবন দিতে হচ্ছে? কেন সাধারণ মানুষকে অপহরণ ও মুক্তিপণের আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে?
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, টেকনাফের কিছু দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অপরাধী চক্রের সদস্যরা আস্তানা গড়ে তুলে অপহরণ ও মানবপাচারের মতো অপরাধে জড়িত। বিদেশে উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা কিংবা জোরপূর্বক তুলে নিয়ে পাহাড়ে আটকে রেখে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করার অভিযোগও রয়েছে।
একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সকালে বাড়ি থেকে বের হলেন। পরিবারের সদস্যরা তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও তিনি ফিরলেন না। এরপর খবর এলো, তাঁকে অপহরণ করা হয়েছে। মুক্তির জন্য দাবি করা হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
সেই পরিবারের পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। কোনো মা সন্তানের জন্য কান্না করেন, কোনো স্ত্রী স্বামীর ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকেন, কোনো সন্তান বাবার মুখ দেখার আশায় দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে।
পরিবারের সামর্থ্য না থাকলে মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ঋণ, দুশ্চিন্তা, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় ভেঙে পড়ে একটি পরিবার। আর অপহৃত ব্যক্তি জীবিত ফিরে না এলে সেই পরিবারের জীবনে নেমে আসে অপূরণীয় শূন্যতা।
এই বেদনাগুলো শুধু একটি পরিবারের নয়; এগুলো একটি জনপদের নিরাপত্তাহীনতার প্রতিচ্ছবি। তাই অপহরণ ও মানবপাচার প্রতিরোধ কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবন, মর্যাদা ও পরিবারের নিরাপত্তা রক্ষারও প্রশ্ন।
২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর উখিয়া ও টেকনাফের জনজীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের প্রভাব স্থানীয় পরিবেশ, বনাঞ্চল, জনসংখ্যা, বাজারব্যবস্থা ও জীবিকার ওপরও পড়েছে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অনেকের মতে, তাঁদের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তার প্রশ্নগুলো আগের তুলনায় আরও জটিল হয়েছে। পাহাড় ও বনাঞ্চল নিয়ে উদ্বেগ, কর্মসংস্থানের চাপ এবং অপরাধের আশঙ্কা তাঁদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে।
তবে কোনো অপরাধের দায় একটি সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়। অপরাধী যে-ই হোক, তার পরিচয় ও দায় নির্ধারণ করতে হবে তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে। একই সঙ্গে নিরপরাধ রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও পরিবারগুলোর মানবিক অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রয়োজন এমন একটি কার্যকর ব্যবস্থা, যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও জীবিকার অধিকার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি আশ্রিত জনগোষ্ঠীর নিরপরাধ মানুষের মানবিক মর্যাদা ও অধিকারও সুরক্ষিত থাকবে।
টেকনাফের পাহাড় শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি এই অঞ্চলের মানুষের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবিকার অংশ। অথচ সেই পাহাড়ে যেতে যদি মানুষকে অপহরণের ভয় করতে হয়, তাহলে জীবিকার পথও সংকুচিত হয়ে আসে।
একজন কৃষক যখন নিজের জমিতে যেতে ভয় পান, তখন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষতি হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা ও স্থানীয় অর্থনীতি। একজন রাখাল যখন গবাদিপশু চরাতে পারেন না, তখন তাঁর আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। একজন শ্রমজীবী মানুষ নিরাপত্তাহীনতার কারণে কাজের সুযোগ হারালে তাঁর সন্তানদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
যে পাহাড় একসময় মানুষের ঘরে খাদ্য জোগাত, সেই পাহাড় যদি আজ মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, তাহলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
অপরাধ দমনে অভিযান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অপরাধী চক্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, অপহরণ ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত দালালদের শনাক্ত করা, অপরাধের অর্থায়ন বন্ধ করা এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি।
আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য কেমন টেকনাফ রেখে যেতে চাই?
আমরা কি এমন একটি জনপদ রেখে যেতে চাই, যেখানে কৃষক নিজের জমিতে যেতে ভয় পাবেন? যেখানে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ঘর থেকে বের হলে স্বজনেরা দুশ্চিন্তায় থাকবেন? যেখানে পাহাড়ের সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে অপহরণ ও সশস্ত্র অপরাধের আতঙ্ক?
নাকি আমরা এমন একটি টেকনাফ চাই, যেখানে পাহাড় হবে জীবিকার নিরাপদ আশ্রয়, নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর হবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উৎস এবং মানুষ নিজের শ্রমের বিনিময়ে সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারবেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পাহাড়ি এলাকায় নিয়মিত নজরদারি বৃদ্ধি, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর যোগাযোগ, অপহরণ ও মানবপাচারের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত এবং অপরাধী চক্রের সহযোগী নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি কৃষক, জেলে, রাখাল ও সাধারণ মানুষের জীবিকা নির্বিঘ্ন রাখতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
টেকনাফের পাহাড়কে আমরা অপরাধের পরিচয়ে চিনতে চাই না। আমরা চাই, এই পাহাড় আবারও পরিচিত হোক সবুজ প্রকৃতি, কৃষকের ফসল, রাখালের গবাদিপশু এবং মানুষের নিরাপদ জীবিকার জন্য।
আমরা চাই না, আর কোনো মা তাঁর সন্তানকে হারিয়ে বুক চাপড়ে কাঁদুন। আর কোনো সন্তানকে বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায় অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হোক। আর কোনো পরিবারকে প্রিয়জনের মুক্তির জন্য সর্বস্ব বিক্রি করে দিতে হোক। দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালনকালে আর কোনো পরিবারকে যেন প্রিয়জন হারানোর অসহনীয় বেদনা বহন করতে না হয়।
একজন সেনাসদস্যের আত্মত্যাগ, অপহৃত মানুষের দুর্ভোগ এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তাহীনতা আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা তুলে ধরেছে—টেকনাফের পাহাড়ে স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
পাহাড়ের বুক থেকে অপরাধের অন্ধকার দূর হোক। কৃষকের মুখে ফিরুক হাসি, রাখালের মনে ফিরুক নির্ভয়তা, পরিবারগুলো ফিরে পাক স্বস্তি। পাহাড়, নদী ও সমুদ্রকে ঘিরে আবারও গড়ে উঠুক নিরাপদ ও সমৃদ্ধ জীবনের স্বপ্ন।
কারণ, একটি পাহাড় শুধু মাটি-পাথরের সমষ্টি নয়; একটি পাহাড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, জীবিকা, স্মৃতি, ভালোবাসা ও ভবিষ্যৎ।
যে পাহাড় একসময় মানুষের মুখে হাসি ফোটাত, সেই পাহাড় আর কোনো মায়ের কান্নার কারণ হোক—এ আমরা চাই না। যে পাহাড় ছিল জীবিকার আশ্রয়, সেই পাহাড় আবারও হয়ে উঠুক মানুষের নিরাপদ বেঁচে থাকার ঠিকানা।















