প্রতিনিধি ৮ নভেম্বর ২০২৬ , ২:২০:৫৫ প্রিন্ট সংস্করণ
অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার মধ্যে নতুন সরকার নির্বাচন করেছে নিউজিল্যান্ড। শনিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দেশটির প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন কমেছে। ফলে কোনো দলই সরকার গঠনের জন্য স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
নির্বাচনে বামপন্থী গ্রিনস পার্টি, ডানপন্থী অ্যাক্ট পার্টি এবং মধ্যপন্থী অপরচুনিটি পার্টি উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। আগে কখনো পার্লামেন্টে আসন না পাওয়া অপরচুনিটি পার্টি এবার সাতটি আসন পেতে পারে। ফলে নতুন সরকার গঠনে দলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ক্ষমতাসীন জোটে কোন দলগুলো থাকবে, তা জানতে আরও কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হতে পারে।
রাজধানী ওয়েলিংটনে নির্বাচনের দিন ঘন কুয়াশার পাশাপাশি ভোটারদের মধ্যে হতাশা ও রাজনৈতিক অনাগ্রহও স্পষ্ট ছিল। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির অর্ধেকের বেশি মানুষ এখন আর নিউজিল্যান্ডকে সুযোগের দেশ মনে করেন না। একই সংখ্যক মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বিগ্ন।
দেশটিতে বর্তমানে ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বেকারত্ব বিরাজ করছে। ২৪ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। চাকরির অভাবে এই বয়সী প্রতি তিনজনের একজন পর্যাপ্ত কাজ পাচ্ছেন না অথবা সম্পূর্ণ বেকার রয়েছেন।
পাশাপাশি বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও উচ্চমূল্যের কারণে দেশটির প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ খাবার গ্রহণ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন। স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকা, চিকিৎসাকর্মীর সংকট এবং চিকিৎসার ব্যয় বৃদ্ধিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এসব সংকটে হতাশ হয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৮০ জন নিউজিল্যান্ড ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। দেশটির ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ বহির্গমনের হার। বিশেষ করে তরুণদের একটি বড় অংশ উন্নত কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার আশায় অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাচ্ছেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী হেলেন ক্লার্কের মতে, এসব সংকট নিউজিল্যান্ডের জাতীয় পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের আত্মবিশ্বাসে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। তাঁর প্রতিষ্ঠানের এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৪০ শতাংশ মানুষ সরকারের ওপর আস্থা রাখেন। তরুণদের মধ্যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশাও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্নের স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসন খাতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লুক্সনের সরকারের সীমিত সাফল্য রাজনৈতিক হতাশা বাড়িয়েছে। ২০২৩ সালে ক্ষমতায় আসার সময় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ন্যাশনাল পার্টি। তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী অগ্রগতি হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তবে দেশের সব খাতে হতাশার চিত্র নেই। কৃষি খাতের কিছু মানুষের মতে, বর্তমান সরকারের আমলে এ খাত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিও ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যেতে পারে বলে তারা আশা করছেন।
সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং জনগণের রাজনৈতিক আস্থা ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনে প্রধান দুই দলের প্রতি ভোটারদের অনাস্থা স্পষ্ট হলেও নতুন সরকার এসব সংকট কতটা মোকাবিলা করতে পারবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।





















