তথ্যপ্রযুক্তি

আড়াইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলা নিয়ে টানাপোড়েন, সিদ্ধান্তহীনতায় প্রশাসন

  স্টাফ রিপোর্টার, মাদারীপুর ১৮ অক্টোবর ২০২৫ , ৭:৫০:৪৬ প্রিন্ট সংস্করণ

মাদারীপুরের কালকিনিতে প্রায় আড়াইশ বছর ধরে চলমান ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলা আয়োজন নিয়ে দু’পক্ষের বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। একপক্ষ মেলা স্থায়ীভাবে বন্ধের দাবি তুললেও অপর পক্ষ ঐতিহ্য রক্ষায় মেলা চালুর দাবিতে অনড় রয়েছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে শনিবার (তারিখ উল্লেখযোগ্য হলে দিন সংশোধনযোগ্য) উভয় পক্ষকে নিয়ে উপজেলা প্রশাসন এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে, তবে সকাল পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি প্রশাসন।

কালকিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফ উল আরেফিন জানান,“মেলা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য শুনেছি। বিষয়টি লিখিতভাবে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে পাঠানো হবে। তারাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।”

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কুন্ডুবাড়ির মেলা স্থায়ীভাবে বন্ধের দাবিতে স্থানীয় জনতা ব্যানারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার দুই শতাধিক মানুষ মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, “সপ্তাহব্যাপী এই মেলাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চুরি, ছিনতাই, ইভটিজিং ও মাদকের লেনদেন বৃদ্ধি পায়। এতে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়।”

মানববন্ধনে বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম মাওলানা গোলাম হোসাইন ও মাওলানা মহাসিন হোসেনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। তারা বলেন, “কুন্ডুবাড়িতে পূজা হবে, কিন্তু মেলা করা যাবে না।”

এ দাবিতে তারা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগও জমা দিয়েছেন।

অন্যদিকে, মেলা চালুর দাবিতে উপজেলা ও পৌরসভা পূজা উদযাপন পরিষদ এবং দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ব্যবসায়ীরা জেলা প্রশাসনের নিকট আবেদন করেন।

পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শ্যামা প্রসাদ পাল বলেন, “প্রায় আড়াইশ বছরের ঐতিহ্য বহন করে এই মেলা। এটি শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সাথে জড়িয়ে আছে। দরিদ্র মানুষ এই মেলা থেকে স্বল্প দামে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে পারেন। তাই শতবর্ষী এই মেলা বন্ধ করা হলে ঐতিহ্য বিনষ্ট হবে।”

কুন্ডুবাড়ির মেলায় অংশ নিতে বগুড়া, রাজশাহী, নওগাঁ, ঢাকা, নোয়াখালী, দিনাজপুর, শরীয়তপুর, জয়পুরহাটসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অন্তত অর্ধশত ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে কালকিনিতে এসে পসরা সাজিয়েছেন।

ব্যবসায়ী **মো. ফারুক প্রামাণিক (বগুড়া), সুমন সরদার (নওগাঁ), সোহেল সিকদার (নোয়াখালী), রাসেল প্রামাণিক (দিনাজপুর), হাসান তালুকদার (রাজশাহী)**সহ অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের দাদা-নানারাও এই মেলায় ব্যবসা করতেন। আমরা ৩০–৪০ বছর ধরে এখানেই ব্যবসা করছি। এখন হঠাৎ করে যদি মেলা বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে পরিবার নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে।”

কালকিনি থানার ওসি কে.এম. সোহেল রানা বলেন,“মেলা ঘিরে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সেদিকে আমরা সতর্ক আছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

 

উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন— উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফ উল আরেফিন,থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে এম সোহেল রানা,আলেম সমাজের প্রতিনিধি মাওলানা আব্দুল বারি, উপজেলা বিএনপির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ফজলুল হক বেপারী, সাধারণ সম্পাদক মাহবুব হোসেন মুন্সী, জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মাউলানা মো. রফিকুল ইসলাম, বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান বেপারী, পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শ্যামা প্রসাদ পালসহ শতাধিক মানুষ।

দীর্ঘ আলোচনা সত্ত্বেও প্রশাসন কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি।

কুন্ডুবাড়ির মেলা কালকিনি পৌর এলাকার গোপালপুরস্থ কুন্ডুবাড়িতে ১৭৮৩ সালের নভেম্বর মাসে দীননাথ কুন্ডু ও মহেশ কুন্ডু প্রথম চালু করেন। দীপাবলি ও শ্রীশ্রী কালীপূজা উপলক্ষে শুরু হওয়া এ মেলার নামকরণ হয় “কুন্ডুবাড়ির মেলা”। প্রায় আড়াইশ বছর ধরে চলে আসা এই মেলা এখন একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

আরও খবর

Sponsered content