শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে খোলা চিঠি

  প্রতিনিধি ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৯:৪১:৩৪ প্রিন্ট সংস্করণ

একই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এমআইএসটি’র ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার সিদ্ধান্তের ফলে হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থী গুরুতর সংকটে পড়েছে।এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকে মো. শফিউর রহমান।

নিচে ওই চিঠি তুলে ধরা হলো-

মাননীয় উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শ্রদ্ধাসহ নিবেদন এই যে, প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়—এটি দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ গড়ার এক নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল। বিশেষ করে বিজ্ঞান অনুষদের ভর্তি পরীক্ষা হাজারো শিক্ষার্থীর জীবনে একটি নির্ণায়ক মুহূর্ত, যার ওপর নির্ভর করে তাদের উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত ভবিষ্যৎ।

গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সঙ্গে আমরা লক্ষ্য করছি যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের স্থগিত ভর্তি পরীক্ষা আগামী ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অথচ একই দিনে দেশের আরেকটি শীর্ষ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি)-এর ভর্তি পরীক্ষাও পূর্বনির্ধারিত রয়েছে। এমআইএসটির ভর্তি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী-২৭ ডিসেম্বর শনিবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ইঞ্জিনিয়ারিং-এ এবং একইদিনে বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত আর্কিটেকচারের ব্যবহারিক পরীক্ষা পূর্ব নির্দেশনা অনুযায়ী যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

পরবর্তীতে ২৩ ডিসেম্বর এমআইএসটির এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে কেবলমাত্র স্থাপত্য বিভাগের দ্বিতীয় পর্বের (ব্যবহারিক) পরীক্ষা ২৭ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ২৮ ডিসেম্বর বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। তবে এমআইএসটির ইঞ্জিনিয়ারিং ও স্থাপত্য বিভাগের প্রথম পর্বের ভর্তি পরীক্ষা ২৭ ডিসেম্বর সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত পূর্বনির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে একই ২৮ ডিসেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ইউনিটের (গাণিতিক ও পদার্থবিজ্ঞান অনুষদ এবং ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি) ভর্তি পরীক্ষা চারটি শিফটে সকাল ১০টা ২৫ মিনিট থেকে বেলা ২টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘোষণা রয়েছে। ফলে একাধিক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা আবারও একই সংকটের মুখে পড়ছেন এবং অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হচ্ছেন জীবনের অন্যতম একটি স্বপ্ন বিসর্জন দিতে।

এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়—বরং অনিবার্য; একজন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী কীভাবে একই দিনে, যানজটের এই শহরে আনুমানিক ১৪ কিলোমিটার দুরত্বের ব্যবধানে দুটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক ও সময়সাপেক্ষ ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলা সাড়ে তিনটায় অনুষ্ঠিতব্য বিজ্ঞান অনুষদের ভর্তি পরীক্ষায় উপস্থিত হবে? এই সময়সূচি কি আদৌ বাস্তবসম্মত, নাকি অনিচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে একটি অসম্ভব ও নিষ্ঠুরতা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে? মেধা ও যোগ্যতার বিচার যেখানে মুখ্য হওয়ার কথা, সেখানে কেবল একটি তারিখের কারণে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন ছেঁটে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসংগত—সে প্রশ্নের উত্তর কি কর্তৃপক্ষ দেবেন?

এই সিদ্ধান্তের ফলে চরম সংকটে পড়েছেন অসংখ্য ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী। যারা দীর্ঘ সময় ধরে নিরলস পরিশ্রম, আত্মত্যাগ ও সীমাহীন ধৈর্যের সঙ্গে উভয় প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন লালন করে আসছেন—তাদের সামনে আজ এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা দাঁড়িয়ে গেছে। চলতি বছরে নানা কারণে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতির জন্য তুলনামূলকভাবে কম সময় পেয়েছেন। তার ওপর একই দিনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভর্তি পরীক্ষা তাদের মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই পরিস্থিতি শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তাদের অভিভাবকরাও চরম দুশ্চিন্তা, হতাশা ও মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। একটি তারিখের কারণে মেধা, যোগ্যতা ও পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্যায়ন থেকে শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত হওয়া—কোনোভাবেই কাম্য নয়।

আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করি যে, রাষ্ট্রীয় শোকের প্রেক্ষাপটে পূর্বনির্ধারিত ২০ ডিসেম্বরের পরীক্ষা স্থগিত করা ছিল একটি মানবিক, যৌক্তিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এ জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রশংসার দাবিদার। তবে অনিচ্ছাকৃতভাবে একই দিনে নতুন তারিখ নির্ধারণের ফলে যে সমন্বয়হীন ও সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা ভর্তিচ্ছুদের জন্য এক অপ্রত্যাশিত সংকট ডেকে এনেছে—যার তার দায় কোনোভাবেই ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের ওপর বর্তায় না।

মাননীয় কর্তৃপক্ষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় শিক্ষার্থীদের ন্যায়সংগত ও মানবিক সিদ্ধান্তকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে—এই বিশ্বাস থেকেই আমরা এই খোলা চিঠি লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আপনাদের একটি সহানুভূতিশীল, দূরদর্শী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, শ্রম ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে পারে।

অতএব, বিনীতভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি—এমআইএসটি’র ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এই তারিখটি পুনর্বিবেচনা করে পুনর্নির্ধারণ করা হোক, যাতে কোনো শিক্ষার্থী ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়। আপনাদের একটি সময়োপযোগী ও সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, শ্রম ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে পারে।

শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক ঐতিহ্যের প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে আপনাদের সদয় ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করছি।

আরও খবর

Sponsered content