প্রতিনিধি ১ নভেম্বর ২০২৬ , ১২:১২:৫৮ প্রিন্ট সংস্করণ
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে টেস্ট সিরিজ খেলতে নামার আগে দলের ব্যাটিং ব্যর্থতা নিয়ে কঠিন প্রশ্ন তোলার আহ্বান জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। গত পাঁচ টেস্টের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো দলের ওপরের সারির ব্যাটসম্যানদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে কেপটাউনে টস জিতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আগে ব্যাটিংয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্তের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেননি অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ হারের পর সাবেক সতীর্থ ডেভিড ওয়ার্নারসহ অনেকের সমালোচনাকে হাসিমুখে উড়িয়ে দিয়েছেন কামিন্স। তবে আগামী ডিসেম্বরে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শীর্ষে থাকা নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে দলের একাদশে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি।
দক্ষিণ আফ্রিকার স্পিনার সাইমন হারমারকে সামলাতে গিয়ে নিজেদের ব্যাটসম্যানরা অতিরিক্ত আগ্রাসী হয়ে পড়েছিলেন বলে স্বীকার করেছেন কামিন্স। পঞ্চম দিনের প্রথম দেড় ঘণ্টার মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার প্রথম সাত ব্যাটসম্যানের ছয়জনকে ফিরিয়ে দেন হারমার। শেষ পর্যন্ত ২৮৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৭৬ রানে হেরে যায় অস্ট্রেলিয়া।
ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের কামিন্স বলেন, ‘কয়েকটি সিদ্ধান্ত ছিল সত্যিই খুব বাজে। জানি, এটি পঞ্চম দিনের উইকেট ছিল। তবে আমার মনে হয় না, উইকেটের অবস্থা এতটা কঠিন ছিল। রান করার সুযোগ ছিল। অনেক বল খেলারও সুযোগ ছিল। কয়েকটি সিদ্ধান্ত আছে, যেগুলো খেলোয়াড়েরা ফিরে পেতে চাইবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম কয়েক ওভারে আমরা পিছিয়ে পড়েছিলাম। হয়তো তখন একটু বেশিই তাড়াহুড়ো করে ফেলেছি। দিনের শুরুতে মাঠে নেমে যেভাবে খেলার কথা ভেবেছিলাম, পরিস্থিতি তার চেয়ে আলাদা হয়ে গিয়েছিল।’
কামিন্সের ভাষায়, ‘আমাদের আরও ভালো করতে হবে। এমন ঘটনা কয়েকবার ঘটেছে। আমরা ভেবেছিলাম, এই লক্ষ্য তাড়া করা পুরোপুরি সম্ভব।’
বিশ্বের এক নম্বর দলের বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে জয়ের সম্ভাব্য শেষ সুযোগটি হাতছাড়া হওয়ায় হতাশ কামিন্স। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যে ক্রিকেট খেলেছি, তার চেয়ে আমাদের দল আরও ভালো। উন্নতির জায়গাগুলো স্পষ্ট।’
দুই মাস আগে ডারউইনে বাংলাদেশের কাছে অপ্রত্যাশিত হারের পর দক্ষিণ আফ্রিকা সফরেও গেকেবেরহা ও কেপটাউনে ভালো অবস্থান থেকে ম্যাচ হেরেছে অস্ট্রেলিয়া। এর ফলে ২০২৬-২৭ মৌসুমে টানা কঠিন টেস্ট সূচির প্রথম দুটি সিরিজেই জয়হীন থাকতে হলো তাদের।
তিনটি পরাজয়ের প্রতিটিতেই ব্যাটিং দুর্বলতা বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। গত সপ্তাহে মাত্র ৯৯ রানে অলআউট হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে সিরিজে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেয় অস্ট্রেলিয়া। শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জেতে স্বাগতিকেরা। এর আগে ডারউইনেও ভালো ব্যাটিং উইকেটে ১৯৮ ও ২৮৪ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া।
ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে টস জিতে আগে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কামিন্স। তার ধারণা ছিল, শুরুতে পেসারদের জন্য সহায়ক পরিবেশ দ্রুত বদলে যাবে। সেই সিদ্ধান্তে এখনো অনড় তিনি। তবে কেপটাউনে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আগে ব্যাটিংয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ততটা আত্মবিশ্বাসী নন। তার ধারণা ছিল, ম্যাচের শুরুতে ব্যাটিং করা কঠিন হতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক টেম্বা বাভুমা মনে করেন, আগে ব্যাটিং করে পরে বোলিং করার সুযোগ পাওয়াটা তাদের জন্য বাড়তি সুবিধা ছিল। প্রথম সকালে দ্রুত রান তোলার পর শেষ দিকে উইকেটের স্পিন সহায়ক হয়ে ওঠায় হারমার ম্যাচের শেষ ছয়টি উইকেট তুলে নেন।
কেপটাউনে টসের সিদ্ধান্ত নিয়ে কামিন্স বলেন, ‘এই উইকেটে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অনেক বিষয় বিবেচনায় রাখতে হয়। প্রথম দিনে আমরা যতটা সহায়ক উইকেট আশা করেছিলাম, বাস্তবে সম্ভবত ততটা ছিল না। তবে টস জিতে কেউই ভাবতে পারে না যে প্রতিপক্ষকে ১০০ কিংবা ২০০ রানে অলআউট করে দেবে।’
তিনি যোগ করেন, ‘আমরা জানতাম, এখানে অনেক রান হবে। তবে ভেবেছিলাম, প্রথম দিনেই ১০ উইকেট তুলে নিতে পারব। সেটি হলে আমরা ম্যাচে অনেকটা এগিয়ে যেতাম। এখন পেছনে ফিরে ভিন্ন পরিস্থিতিতে কী হতে পারত, তা ভাবতে ভালো লাগত। কিন্তু বাস্তবে সেই সুযোগ তো আর নেই।’
টসের সিদ্ধান্তে স্টিভ স্মিথের ঘাড়ের সমস্যার কারণে শেষ মুহূর্তে দল থেকে ছিটকে যাওয়ার কোনো প্রভাব ছিল না বলেও জানিয়েছেন কামিন্স।
২০২৩ সালের অ্যাশেজের শেষ থেকে ২০২৫ সালের শেষ ভাগ পর্যন্ত ২১ টেস্টের মধ্যে ১৭টিতে জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া। সেই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল দলের দুর্দান্ত বোলারদের। পাশাপাশি প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ব্যাটসম্যানদের কেউ না কেউ আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে সফল হতেন।
তবে ব্যাটিংয়ের জন্য তুলনামূলক ভালো উইকেটে কামিন্স ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকে আরও ধৈর্য ও দৃঢ়তা প্রত্যাশা করছেন। তার মতে, সাম্প্রতিক তিনটি পরাজয়েই এসবের অভাব ছিল।
কামিন্স বলেন, ‘টেস্ট ক্রিকেটের একটি বড় সৌন্দর্য হলো, এক সপ্তাহে এমন উইকেট পাওয়া যায়, যেখানে ৪০ কিংবা ৫০ রানও অনেক মূল্যবান এবং ম্যাচ জেতাতে পারে। আবার পরের সপ্তাহেই অনেক বেশি বল খেলতে হয়। তখন লড়াইটা হয়ে ওঠে ধৈর্য ও সহনশীলতার।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়, ভিন্ন পরিস্থিতিতে খেলার এই ধরনগুলো আমরা যথেষ্ট ভালোভাবে সামলাতে পারিনি। বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করি। এই সিরিজে দেখা গেছে, অনেক রান এসেছে টেস্ট ক্রিকেটের সেই পুরোনো শিক্ষার ওপর ভর করে—বেশি বল খেলতে পারলে ব্যাটিং কিছুটা সহজ হয়ে আসে।’
কামিন্সের মতে, সব পরিস্থিতিতে একই নিয়ম কার্যকর হয় না। তবে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর, এমনকি ডারউইনেও এমন কিছু মুহূর্ত ছিল, যখন উইকেটে টিকে থাকলে ব্যাটসম্যানরা পুরস্কৃত হতে পারতেন। তার ভাষায়, ‘সব সময় এমনটা হয় না। তাই একটিই নিয়ম সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে এখানে, এমনকি ডারউইনেও, কিছু মুহূর্ত ছিল যখন উইকেটে টিকে থাকলে ফল পাওয়া যেত। আপনি ধৈর্য ধরে লড়াই করলে খেলাটাই একসময় আপনার দিকে আসবে।’
পঞ্চম দিনে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ধসকে ডেভিড ওয়ার্নার ‘লজ্জাজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে আট বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকায় টেস্ট সিরিজ খেলতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার কিছু ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে।
ম্যাথু রেনশ এই সফরে নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করেছেন। নিউল্যান্ডসে প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করে দলের মাঝের সারিতে নিজের জায়গা আরও পোক্ত করেছেন জশ ইংলিস। আর ক্যামেরন গ্রিন অস্ট্রেলিয়ার ওপরের সারির ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পথে এগিয়েছেন। তৃতীয় টেস্টে ব্যাট হাতে আশাব্যঞ্জক প্রত্যাবর্তন করেছেন কুপার কনোলিও।
তবে সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার ওপরের সারির সাত ব্যাটসম্যানের মধ্যে পাঁচজনের গড় ছিল ২২-এর নিচে। মারনাস লাবুশেন ২১.৮৩ গড়ে করেছেন ১৩১ রান। তার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কেপটাউনে কনোলির জায়গায় বাদ পড়া ব্যু ওয়েবস্টারের অবস্থাও অনিশ্চিত।
নিক ম্যাডিনসনকে দলে ফেরানোর পরীক্ষাও সফল হয়নি। ১৯ মাস প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের বাইরে থাকার পর বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান সিরিজে ১৪ গড়ে করেছেন মাত্র ৫৬ রান। অন্যদিকে স্টিভ স্মিথ ২০.৭৫ গড়ে করেছেন ৮৩ রান, যা পরিসংখ্যানের বিচারে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বাজে সিরিজ।
সিরিজ হারের পর দলে পরিবর্তনের দাবি ওঠা স্বাভাবিক বলে মনে করেন কামিন্স। তিনি বলেন, ‘সিরিজ হারলে সব সময়ই এমন দাবি ওঠে, আর সম্ভবত সেটি যথার্থও। আমরা টানা দুটি ম্যাচ হারলে এমন প্রশ্ন তোলাটা ন্যায্য। দলের ভেতরেও আমরা এসব প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করব।’
দলের উন্নতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক বলেন, ‘আমরা খুব ভালো দল। তবে আবার এক নম্বরে ফিরতে এবং নিজেদের প্রত্যাশার জায়গায় পৌঁছাতে হলে আরও ভালো হতে হবে। এর জন্য হয়তো খেলার ধরনে পরিবর্তন আনতে হবে, আবার কিছু ক্ষেত্রে খেলোয়াড়ও বদলাতে হতে পারে।’
শেষে কামিন্স বলেন, ‘আমাদের কয়েক সপ্তাহ সময় দিন। এর মধ্যেই আমরা বিষয়গুলো ঠিক করে ফেলব।’















