সারাদেশ

রংপুরে আলুর বাম্পার ফলনেও কৃষকের কান্না, লোকসান হাজার কোটি টাকার আশঙ্কা

  মো: সাকিব চৌধুরী, স্টাফ রিপোর্টার ৮ মে ২০২৬ , ১১:৪৪:০৭ প্রিন্ট সংস্করণ

আলু উৎপাদনের প্রধান অঞ্চল হিসেবে পরিচিত রংপুরে চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। ভরা মৌসুমে আলুর নজিরবিহীন মূল্যধস এবং বৈরী আবহাওয়ায় সংরক্ষিত আলুতে পচন ধরায় চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষিরা। উপায়ান্তর না দেখে অনেক কৃষক বস্তাভর্তি আলু রাস্তার ধারে ফেলে দিচ্ছেন।

শুক্রবার (৮ মে) কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবার প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে ১৩ থেকে ১৫ টাকা। অথচ বর্তমানে বাজারে পাইকারি পর্যায়ে আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭ থেকে ৯ টাকায়। ফলে প্রতি কেজিতে কৃষকের লোকসান হচ্ছে ৬ থেকে ৮ টাকা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে হিমাগার ভাড়া ও পরিবহন ব্যয়ের বাড়তি চাপ।

রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তার ধারে স্তূপ করে রাখা পচা আলুর দুর্গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। কৃষকদের অভিযোগ, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে মণপ্রতি আলুর দাম কমেছে প্রায় ২০০ টাকা। বর্তমানে প্রতি মণ আলু বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়, যেখানে উৎপাদন খরচই ছিল ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা।

পীরগাছা উপজেলার কৃষক বকুল মিয়া জানান, শুরুতে দাম না পেয়ে আলু ঘরে তুলে রাখলেও সংরক্ষণের অভাবে পচন ধরায় প্রায় ৫০ বস্তা আলু তাঁকে রাস্তায় ফেলে দিতে হয়েছে।

একই উপজেলার কল্যাণি গ্রামের কৃষক আব্দুল হক বলেন, “গত বছর আলু আবাদ করে ৫০০ বস্তা আলু হিমাগারে রেখেছিলাম। শেষ পর্যন্ত দাম না পাওয়ায় সেই আলু বের করার সাহস হয়নি। এবারও আলু আবাদ করে ধ্বংসের মুখে পড়েছি।”

তাম্বুলপুর ইউনিয়নের বগুড়াপাড়া গ্রামের আলুচাষি হোসেন বলেন, “বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করে খরচই উঠছে না। উৎপাদন খরচের চেয়ে অর্ধেকেরও কম এখন আলুর দাম।”

একই এলাকার কৃষক আলম ও আজিজ মিয়া জানান, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে দেড় একর জমিতে আলু চাষ করেছিলেন তারা। বৈরী আবহাওয়া এবং সার-কীটনাশকের সংকটের মধ্যেও বেশি দামে কৃষি উপকরণ কিনে প্রায় ১৫ হাজার কেজি আলু উৎপাদন করেন। কিন্তু বাজারে দাম কম থাকায় সেই আলু ঘরে মজুত করে এখন বিপাকে পড়েছেন।

আলুচাষিদের দাবি, উৎপাদিত আলুর প্রায় ৭০ শতাংশ সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকায় মৌসুমেই কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। কৃষকদের মতে, আলু রপ্তানি বাড়ানো গেলে তারা ন্যায্যমূল্য পেতেন।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৬ লাখ ৫ হাজার ২৫ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ের হিসাব মিলিয়ে দেখা যায়, শুধু মূল্যধসের কারণেই কৃষকদের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৬৩ কোটি টাকা। আর বৈরী আবহাওয়াজনিত পচন ও হিমাগার ভাড়ার চাপ যুক্ত হলে ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জেলার কাউনিয়া, মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ ও বদরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, হিমাগারগুলোতে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকা এবং বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে তারা নতুন করে আলু কিনতে সাহস পাচ্ছেন না।

কল্যাণি ইউনিয়নের কৃষক মিজানুল ইসলাম জানান, লিজ নেওয়া জমিতে আলু চাষ করতে তিনি নিজের গরু বিক্রি করেছেন এবং সারের দোকান থেকেও বাকি নিয়েছেন। কিন্তু বাজারে পাইকার না পাওয়া এবং ঘরে রাখা আলু পচে যাওয়ায় তিনি এখন নিঃস্ব হওয়ার পথে। অনেক কৃষক গত বছরের হিমাগার ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় এবার নতুন করে আলু সংরক্ষণের সাহসও পাচ্ছেন না।

রংপুর অঞ্চলের কৃষকদের এই মহাবিপদ মোকাবিলায় সরকারিভাবে বিশেষ নজরদারি, কৃষি সহায়তা ও আলু রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তা না হলে আলুচাষিদের বড় অংশ ভয়াবহ ঋণসংকটে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বৈরী আবহাওয়া, মূল্যধস এবং হিমাগার ভাড়া বৃদ্ধি মিলিয়ে এ বছরের আলু মৌসুমকে কৃষকরা আখ্যা দিচ্ছেন “মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা” হিসেবে।

আরও খবর

Sponsered content