আন্তর্জাতিক

কঙ্গোতে ইবোলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩১

  প্রতিনিধি ২০ মে ২০২৬ , ১০:৪৪:১৫ প্রিন্ট সংস্করণ

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের পূর্বাঞ্চলে ইবোলা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টায় আরও ২৬ আক্রান্তের মৃত্যুর সংবাদ জানিয়েছে। এ নিয়ে ভাইরাসটির সংক্রমণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩১ জন।

মঙ্গলবার বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

কঙ্গোর স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ৫৪৩টি সন্দেহজনক সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে এবং ৩৩টি সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী উগান্ডায়ও দুটি নিশ্চিত সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানম গেব্রেয়েসুস শনিবার এই প্রাদুর্ভাবকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেন। জরুরি কমিটির বৈঠকের আগেই এমন ঘোষণা দেওয়ার ঘটনা এই প্রথম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিরল বান্ডিবুগিও ধরনের এই ভাইরাস কয়েক সপ্তাহ ধরে শনাক্ত না হয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এবং সহিংসতায় বিপর্যস্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এর আগে ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে পূর্ব কঙ্গোতে ইবোলার আরেকটি ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

কঙ্গোর জাতীয় জৈব-চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক জ্যঁ-জাক মুয়েম্ব জানান, ‘সোমবার কয়েক লাখ মানুষের শহর বুতেম্বোতে প্রথম দুটি নিশ্চিত সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।’

এদিকে উগান্ডা সীমান্তে চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা অ্যামব্রোস আমানইরে মুসেগিয়ে জানান, ‘ইশাশা-কিয়েশেরো সীমান্তপথে মানুষের চলাচল সীমিত করা হয়েছে, যদিও সীমান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করা হয়নি।’

অন্যদিকে গোমা ও বুকাভু শহর থেকে রুয়ান্ডায় প্রবেশের চেষ্টা করা অনেককে সীমান্তে আটকে দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সীমান্ত বন্ধ না করার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, সীমান্ত বন্ধ হলে মানুষ অনিয়ন্ত্রিত ও অপ্রাতিষ্ঠানিক পথে যাতায়াত করবে, যা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তুলবে।

ইবোলা আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রাণীর দেহতরলের সংস্পর্শে ছড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, এই রোগে গড়ে মৃত্যুহার প্রায় ৫০ শতাংশ।

জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদের বৈঠকে তেদরোস বলেন, ‘মহামারির বিস্তার এবং গতি নিয়ে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’

কঙ্গোতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি অ্যান আনসিয়া জানান, ‘বান্ডিবুগিও ধরনের ভাইরাস শনাক্তে সীমিত পরীক্ষার সক্ষমতার কারণে রোগী শনাক্তে বিলম্ব হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ছয়টি পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় দাতাগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সিয়েরা লিওনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী অস্টিন ডেম্বি বলেন, ‘মনে হচ্ছে আমরা মহামারির অভিজ্ঞতা থেকে কিছুই শিখিনি, সবাই আবার আগের মতোই কাজ করছে।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র জানিয়েছে, এক মার্কিন নাগরিকের শরীরে ইবোলা শনাক্ত হয়েছে। খ্রিস্টান মিশন সংস্থার মাধ্যমে তার পরিচয় ডা. পিটার স্ট্যাফোর্ড হিসেবে জানা গেছে। আক্রান্ত ব্যক্তি এবং সংস্পর্শে আসা আরও ছয় মার্কিন নাগরিককে চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের জন্য জার্মানিতে নেওয়া হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র গত ২১ দিনের মধ্যে কঙ্গো, উগান্ডা বা দক্ষিণ সুদানে অবস্থান করা ব্যক্তিদের প্রবেশে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। একই সঙ্গে মার্কিন নাগরিকদের ওই দেশগুলোতে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আফ্রিকা রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র সতর্ক করে বলেছে, এ ধরনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা অর্থনীতির ক্ষতি করতে পারে, স্বচ্ছতা কমাতে পারে এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বান্ডিবুগিও ধরনের ইবোলার জন্য এখনো অনুমোদিত কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ বা টিকা নেই। যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য চিকিৎসা হিসেবে এক ধরনের একক-কণিকা প্রতিরোধী চিকিৎসা পদ্ধতি উন্নয়নের কাজ করছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ৫০টি চিকিৎসাকেন্দ্র চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে দুর্গম গ্রামীণ এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হওয়ায় কার্যক্রমে চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল সম্ভাব্য টিকা নিয়ে আলোচনা করছে। অ্যান আনসিয়া জানিয়েছেন, ‘সম্ভাব্য টিকা হিসেবে একটি বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির টিকার কথা বিবেচনায় আছে, তবে সেটি হাতে পেতে অন্তত দুই মাস সময় লাগতে পারে।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করেন। তবে অ্যান আনসিয়া বলেছেন, ‘ইবোলা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে সংস্থাটির সমন্বয় ভালোভাবেই চলছে, যদিও স্বাস্থ্য খাতে অর্থ কমে যাওয়ায় রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।’

আরও খবর

Sponsered content