প্রতিনিধি ১ জুলাই ২০২৬ , ২:৫৫:০২ প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটবলপ্রেমীদের মনে উঁকি দিচ্ছে আরেকটি আবেগঘন প্রশ্ন- এটাই কি শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা যাচ্ছে বর্তমান প্রজন্মের কিছু কিংবদন্তিকে? বয়স, সময় এবং ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় বিবেচনায় অনেক তারকাই হয়তো ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে আর থাকবেন না। তাদের মধ্যেই সবচেয়ে আলোচিত ১০ ফুটবলারের একটি তালিকা তৈরি করেছে বার্তাসংস্থা বিবিসি।
১। লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা)
৩৯ বছর বয়সেও বিশ্বকাপে রেকর্ড ভেঙেই চলেছেন লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৯ গোলের পাশাপাশি তার রয়েছে ৮টি অ্যাসিস্ট। টানা সাতটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার কীর্তিও গড়েছেন তিনি।
২০১৪ সালে রানার্সআপ হলেও টুর্নামেন্টসেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল জিতেছিলেন। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার পাশাপাশি আবারও জেতেন সেই পুরস্কার। এটি তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ, আর বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে ৩০তম ম্যাচ খেলতে যাচ্ছেন তিনি। দুই শতাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা এই কিংবদন্তিকে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে না দেখা গেলে সেটি হবে ফুটবল বিশ্বের জন্য এক কঠিন বাস্তবতা।
২। লুকা মদরিচ (ক্রোয়েশিয়া)
৪০ বছর ২৯১ দিন বয়সে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সী ফুটবলার হিসেবে অ্যাসিস্ট করার রেকর্ড গড়েছেন লুকা মদরিচ। সতীর্থ পেতার সুচিচের ভাষায়, ‘তিনি যেন এখনো ২০ বছরের তরুণ।’
মাত্র ৪০ লাখেরও কম জনসংখ্যার দেশ ক্রোয়েশিয়াকে ২০১৮ সালে ফাইনাল এবং ২০২২ সালে তৃতীয় স্থানে তুলতে মদরিচের অবদান অসাধারণ। ২০০৬ সালে অভিষেকের পর পাঁচটি বিশ্বকাপে ২২টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। জাতীয় দলের হয়ে তার ম্যাচসংখ্যাও ২০০ ছাড়িয়েছে।
৩। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল)
আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ ২৩১ ম্যাচ ও ১৪৫ গোলের মালিক ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ট্রফি ক্যাবিনেটে শুধু বিশ্বকাপটাই নেই।
এটি তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। এখন পর্যন্ত ২৫ ম্যাচে করেছেন ১০ গোল। ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা একমাত্র ফুটবলারও তিনি। রোনালদোর জন্য এবারই সম্ভবত বিশ্বকাপ জয়ের শেষ সুযোগ।
৪। মানুয়েল নয়্যার (জার্মানি)
২০১৪ সালে জার্মানির বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কত্বের অন্যতম নায়ক ছিলেন গোলরক্ষক মানুয়েল নয়্যার। সেই আসরে গোল্ডেন গ্লাভও জিতেছিলেন তিনি।
৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক আন্তর্জাতিক অবসর ভেঙে আবার জাতীয় দলে ফিরেছেন। যদিও এবারের বিশ্বকাপে জার্মানির হতাশাজনক বিদায় তার শেষ বিশ্বকাপকে ম্লান করেছে, তবু সর্বকালের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক হিসেবেই স্মরণীয় থাকবেন তিনি।
৫। নেইমার (ব্রাজিল)
বিশ্বকাপে নেইমারের নাম এলেই মনে পড়ে ২০১৪ সালের সেই দুঃস্বপ্ন। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা অবস্থায় কোয়ার্টার ফাইনালে পিঠে চোট পেয়ে ছিটকে যান তিনি। এরপরই সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ ব্যবধানে বিধ্বস্ত হয় ব্রাজিল।
২০১৮ ও ২০২২ দুই বিশ্বকাপেই দুটি করে গোল করেছেন। ৩৪ বছর বয়সী নেইমার চোটের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে আবারও জাতীয় দলে ফিরেছেন। ১৪ বিশ্বকাপ ম্যাচে তার অবদান ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট।
৬। কেভিন ডি ব্রুইনা (বেলজিয়াম)
বেলজিয়ামের ‘গোল্ডেন জেনারেশন’-এর অন্যতম মুখ কেভিন ডি ব্রুইনা, কিন্তু সেই প্রজন্ম কখনোই বিশ্বকাপ জিততে পারেনি।
৩৫ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলছেন। ১৬ ম্যাচে করেছেন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট। এবার নকআউটে বেলজিয়ামের ভাগ্য নির্ধারণেও তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
৭। ভার্জিল ফন ডাইক (নেদারল্যান্ডস)
নেদারল্যান্ডস ২০১৮ বিশ্বকাপে খেলতে না পারায় বিশ্বকাপে ফন ডাইকের ম্যাচসংখ্যা মাত্র আটটি। ২০২২ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত ওঠা দলের অধিনায়ক ছিলেন তিনি।
এবারও গোল দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয় নেদারল্যান্ডস। ৩৪ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডারের জন্যও এটি শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে।
৮। মোহাম্মদ সালাহ (মিশর)
৩৪ বছর বয়সী মোহাম্মদ সালাহর নেতৃত্বে মিশর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে গোল ও অ্যাসিস্ট করে দলের জয় নিশ্চিত করেন তিনি।
২০১৮ সালে চোট নিয়েও দুটি গোল করেছিলেন সালাহ। বিশ্বকাপে পাঁচ ম্যাচে তার মোট অবদান ৩ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট। শেষ ষোলোয় উঠতে পারলে মেসির আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে তার।
৯। সন হিউং-মিন (দক্ষিণ কোরিয়া)
দক্ষিণ কোরিয়ার হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৩ ম্যাচ ও ৩ গোলের রেকর্ড এখন সন হিউং-মিনের দখলে।
৩৩ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের জন্য এবারের বিশ্বকাপ অবশ্য হতাশার। গ্রুপ পর্বে কোনো গোল বা অ্যাসিস্ট করতে পারেননি, এমনকি শেষ ম্যাচে শুরুর একাদশেও ছিলেন না। চারটি বিশ্বকাপ খেলা সনের সেরা স্মৃতি এখনো ২০১৮ সালে জার্মানির বিপক্ষে জয়।
১০। সাদিও মানে (সেনেগাল)
সাদিও মানের নেতৃত্বেই টানা তিনটি বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে সেনেগাল। ২০১৮ বিশ্বকাপে তার একমাত্র গোলটি করেছিলেন তিনি। তবে হাঁটুর চোটে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ খেলতে পারেননি।
কাতার বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে মিশরের বিপক্ষে জয়সূচক টাইব্রেকার কিকে দলকে বিশ্বকাপে তুলেছিলেন মানে। ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের জন্যও ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব শুধু নতুন নায়কের জন্মই দেয় না, অনেক সময় এটি হয়ে ওঠে কিংবদন্তিদের বিদায়ের মঞ্চও। মেসি, রোনালদো, মদরিচ, নেইমার, নয়্যার কিংবা ডি ব্রুইনার মতো তারকারা তাদের অসাধারণ ক্যারিয়ারে ফুটবল ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছেন। এবার তাদের কেউ বিশ্বকাপ জিতবেন, কেউ বিদায় নেবেন অপূর্ণ স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু ফলাফল যাই হোক, বিশ্বকাপের ইতিহাসে তাদের অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।














