প্রতিনিধি ১৫ জুলাই ২০২৬ , ১১:৫৪:০১ প্রিন্ট সংস্করণ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। যুদ্ধবিরতির জন্য স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক কার্যত ভেঙে পড়ার পর একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে দুই দেশ। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নৌপথে চলাচল নিয়ে নতুন করে বিরোধ সামনে এসেছে।
সোমবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, চুক্তি মেনে চলার ক্ষেত্রে ইরানের ওপর ভরসা করা যায় না। যুদ্ধ সাময়িকভাবে বন্ধে হওয়া সমঝোতা স্মারকের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘এটি একটি চূড়ান্ত চুক্তি ছিল, কিন্তু তারা তা ভেঙেছে। তারা সব সময়ই চুক্তি ভঙ্গ করে।’
তবে ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর সমালোচকেরা মনে করিয়ে দেন, নিজের প্রথম মেয়াদে তিনি ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তিসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সমঝোতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেছিলেন। তাদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে সেই সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ মাশুল আরোপের ট্রাম্পের ঘোষণাকে ব্যঙ্গ করেছে তেহরান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি লিখেছেন, ট্রাম্পের বক্তব্যই কার্যত প্রণালিতে যাতায়াতের জন্য মাশুল নেওয়ার বিষয়ে ইরানের অবস্থানকে বৈধতা দিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি কটাক্ষ করে বলেন, ট্রাম্প যে ২০ শতাংশ মাশুলের কথা বলেছেন, তা অনেক বেশি এবং ইরান এ ক্ষেত্রে ন্যায্য আচরণ করবে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্প এখন এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে ইরান সমঝোতা স্মারকের ব্যাখ্যা নিজেদের অবস্থান অনুযায়ী তুলে ধরছে। যে সংঘাতকে ট্রাম্প আগে কার্যত শেষ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছিলেন, তা আবারও নতুন করে তীব্র হওয়ায় ওয়াশিংটনের কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সম্প্রতি হিউ হিউইটের রেডিও অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধবিরতির সমঝোতাটি ছিল একটি পরীক্ষা এবং ইরান সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। তার ভাষায়, ওই সমঝোতার বিশেষ কোনো গুরুত্ব ছিল না।
বিশ্লেষকদের মতে, সমঝোতা ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে দুই পক্ষের ভিন্ন ব্যাখ্যা। সমঝোতা অনুযায়ী ৬০ দিনের জন্য প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করার কথা ছিল।
তবে পর্যবেক্ষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে এটিকে সাময়িক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখেছে, সেখানে ইরান এটিকে ভবিষ্যতেও হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার একটি স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে তেহরান সক্রিয় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের আরও মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং হরমুজ প্রণালির মতো জটিল ইস্যুতে মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সমঝোতায় পৌঁছানোর পরিকল্পনা শুরু থেকেই বাস্তবসম্মত ছিল না।
এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান ও নৌ-অবরোধ আরোপের সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে অল্পসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেই ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বর্তমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যয় বাড়তে থাকলে ওয়াশিংটনের ওপরও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে















