প্রতিনিধি ২৮ অক্টোবর ২০২৬ , ৩:০৬:১২ প্রিন্ট সংস্করণ
ইসরায়েলের যুদ্ধ, অবরোধ, ক্ষুধা ও বাস্তুচ্যুতির অভিজ্ঞতা এবার উঠে এসেছে ফিলিস্তিনি তরুণ নারী নির্মাতাদের পাঁচটি প্রামাণ্যচিত্রে। ব্যক্তিগত বেদনা ও গাজার মানুষের টিকে থাকার সংগ্রামকে কেন্দ্র করে নির্মিত এসব চলচ্চিত্র সোমবার গাজা আন্তর্জাতিক নারী চলচ্চিত্র উৎসবের দ্বিতীয় আসরের উদ্বোধনী আয়োজনে প্রদর্শিত হয়েছে। একই অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে গাজা সিনেমা একাডেমি। বার্তাসংস্থা আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
মধ্য গাজার আল-বুরেইজ এলাকায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া আল-নাখিল হলের স্থানে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ছিল ‘মৃত্যুর মধ্য থেকে জীবনের সৃষ্টি করছেন নারীরা’। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন বছর ধরে চলা ইসরায়েলের যুদ্ধে গাজার বিপুলসংখ্যক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। যুদ্ধে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উৎসবে প্রদর্শিত পাঁচটি প্রামাণ্যচিত্রের মধ্যে অন্যতম ‘আ স্যাক অব ফ্লাওয়ার’ বা ‘এক বস্তা আটা’। উদীয়মান নির্মাতা মোনা আবু কাসের ১১ মিনিটের এই চলচ্চিত্রে গাজায় খাদ্য সংগ্রহের লড়াই, ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে বিপদের মুখে পড়া মানুষ এবং আটা সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রাণ হারানোর ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নির্মিত চলচ্চিত্রটিতে আবু কাস দেখিয়েছেন, খাবার আবার পাওয়া গেলেও ক্ষুধার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা কীভাবে পরিবারগুলোর মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। গাজায় পণ্য প্রবেশে ইসরায়েলের বিধিনিষেধ এবং খাদ্যসহায়তা কমে যাওয়ায় নতুন করে খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা দেখা দেওয়ার প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্রটির বিষয়বস্তু বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
আল জাজিরাকে আবু কাস বলেন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সত্য ঘটনা থেকেই চলচ্চিত্রটির ভাবনা এসেছে। বোমাবর্ষণ, ধ্বংসযজ্ঞ, অবরোধ, ক্ষুধা ও স্বজন হারানোর মধ্যে গাজার মানুষের প্রতিদিনের জীবন এতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি। তার লক্ষ্য, মানুষের দুর্ভোগের পাশাপাশি বেঁচে থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষা এবং যুদ্ধ কীভাবে তাদের সম্পর্ক, স্বপ্ন ও আশাকে বদলে দিয়েছে, তা দর্শকদের সামনে আনা।
উৎসবে প্রদর্শিত আরেকটি চলচ্চিত্র ‘বিয়ন্ড সাইলেন্স’। উদীয়মান নির্মাতা ও সাংবাদিক রাগদা আল-বুহাইসির এই প্রামাণ্যচিত্রে যুদ্ধের মধ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে। চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন বধির শিল্পী, যিনি কখনো পড়তে-লিখতে শেখেননি এবং সাংকেতিক ভাষার মাধ্যমেও যোগাযোগ করতে পারেন না।
দক্ষিণ গাজার রাফাহ শহরে ওই শিল্পীর চিত্রকর্ম তৈরির স্টুডিওটি ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়। তার বাবা-মা ও পরিবারের কয়েকজন সদস্যও নিহত হন। পরে মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর আরেকটি পরিবার তাকে আশ্রয় দেয় এবং রাস্তার পাশে ছোট একটি স্টুডিও গড়ে তুলতে সহায়তা করে। তার আঁকা ছবিতে রং ও রেখার মাধ্যমে ফুটে ওঠে স্বজন হারানো, বাস্তুচ্যুতি ও গভীর বেদনার অভিজ্ঞতা।
আল-বুহাইসি বলেন, যুদ্ধের সময় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বাড়তি সংকট বাস্তুচ্যুতি, পরিবারের সদস্যদের হারানো এবং জীবিকার অবলম্বন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরাই তার উদ্দেশ্য। তার মতে, শিল্প ভাষা ও নীরবতার বাধা অতিক্রম করে ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে এমন এক দৃশ্যমান বার্তায় রূপ দিতে পারে, যা গাজার মানুষের দুর্ভোগ বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেয়।
বাকি তিনটি চলচ্চিত্র হলো ‘সোসো: দ্য লাইফলাইন’, ‘রেমেন্যান্টস অব লাইট’ এবং ‘দানদানা’। প্রথম চলচ্চিত্রে এক এতিম শিশু ও তার গাধার মাধ্যমে গাজার মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম দেখানো হয়েছে। ‘রেমেন্যান্টস অব লাইট’-এ নিজের পরিবার ও বাড়ি হারানো এক চলচ্চিত্র নির্মাতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। আর ‘দানদানা’য় দেখা যায়, আট সন্তানকে হারানো এক মা বেঁচে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফিলিস্তিনি গান গেয়ে শোক সামলানোর চেষ্টা করছেন।
এই পাঁচটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ ডিপ্লোমা কর্মসূচির আওতায়। গত মার্চে শুরু হওয়া ওই কর্মসূচিতে অংশ নেন ২৫ জন তরুণ ফিলিস্তিনি নারী।
উৎসবের পরিচালক এজ্জেদিন শাল্লাহ বলেন, চলচ্চিত্রগুলোতে যুদ্ধের মধ্যে নারী ও মেয়েদের প্রত্যক্ষ করা অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। এগুলো একদিকে গাজার দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্যভিত্তিক দলিল, অন্যদিকে নারীদের নিজেদের কণ্ঠে নিজেদের গল্প বলার একটি সুযোগ।
তার মতে, চলচ্চিত্রগুলোর বিষয় আলাদা হলেও ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে বৃহত্তর মানবিক গল্পে রূপ দিয়েছে এগুলো। যুদ্ধের মানসিক ও সামাজিক ক্ষত তুলে ধরার পাশাপাশি এমন অনেক অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করছে, যা অন্যথায় পর্দায় হয়তো কখনোই আসত না।
৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এবারের উৎসবে ২৪টি দেশের ৭৩টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। গাজার নির্মাতাদের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের চলচ্চিত্রকারদের কাজও এতে স্থান পেয়েছে।
তবে গাজায় চলচ্চিত্র নির্মাণ এখনো নানা বাধার মুখে। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, সরঞ্জামের সংকট, অর্থায়নের অভাব, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগে বিঘ্ন এবং যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির চাপ নির্মাণকাজকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে নারী নির্মাতাদের প্রশিক্ষণ, প্রযোজনার সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা।





















