প্রচ্ছদ

ইসরায়েল-ইরান সংঘর্ষে থেমেছে গোলাগুলি, কূটনীতির পথে সমঝোতার আভাস

  প্রতিনিধি ২৭ জুন ২০২৫ , ৪:৩৩:২১ প্রিন্ট সংস্করণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:  মধ্যপ্রাচ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে হঠাৎ থেমে গেছে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘর্ষ। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের বেইরসেবা ও বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনায় ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ ‘অঘোষিত যুদ্ধবিরতিতে’ সম্মত হয়েছে। তবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি।

সংঘর্ষের সূত্রপাত
ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই দেশটির ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। প্রতিক্রিয়ায় তেহরান কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে। এরপরই শুরু হয় একের পর এক হামলা-পাল্টা হামলা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই হামলা ইরানের পক্ষে এক বড় কৌশলগত বার্তা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় মার্কিন ঘাঁটিতে সরাসরি হামলা চালিয়ে ইরান তার সামরিক সক্ষমতা ও মনস্তাত্ত্বিক শক্তির জানান দিয়েছে।

ট্রাম্পের উদ্যোগে থেমে গেল সংঘর্ষ:
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কাতারের আমিরকে ফোন করে যুদ্ধবিরতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তার অনুরোধে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান আল থানি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং যুদ্ধবিরতির বিষয়ে একধরনের মৌখিক সমঝোতা অর্জিত হয়।

এই সংলাপ হয় সোমবার রাতে, ইরান যখন আল-উদেইদ ঘাঁটিতে হামলা চালায় তার কয়েক ঘণ্টা পর। এরপর থেকে গত ১২ ঘণ্টা দুই পক্ষে কোনো নতুন হামলার খবর পাওয়া যায়নি।

ইসরায়েলের লক্ষ্য ব্যর্থ, ইরান উঠে এসেছে কৌশলগত সুবিধায়:
ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য ছিল, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস ও সরকারের পতন ঘটানো। তবে বাস্তবতা হলো, তেহরান তার পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পেরেছে এবং সরকারবিরোধী কোনো বিদ্রোহ দেখা যায়নি।

বরং ইরান সামরিক, কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে নিজের শক্তি প্রমাণ করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েল ‘অজেয়’—এই ধারণাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে বুঝা যাচ্ছে, দখলদার রাষ্ট্রটি আর সুবিধাজনক অবস্থানে নেই।

ক্ষয়ক্ষতির হিসাব:
ইরানে নিহত: ৬০৬ জন

ইরানে আহত: ৫,০০০+

ইসরায়েলে নিহত: সরকারিভাবে ২৮ জন, সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি হতে পারে

ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত: বেইরসেবা, তেল আবিব, হাইফা, নেস সিয়োনা, বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও গবেষণা কেন্দ্র

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, নেস সিয়োনায় ইসরায়েল ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিক্যাল রিসার্চ (IIBR)-এ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত। এই কেন্দ্রটিকে ইসরায়েলের সবচেয়ে গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সমীকরণ:
ইরান ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় দুই দেশের মধ্যে সরাসরি চুক্তি অসম্ভব। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বা সমঝোতার সম্ভাবনা রয়েছে। কাতার, রাশিয়া ও চীনের মধ্যস্থতায় এমন একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

তেহরানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরছে:
সংঘাত শুরু হওয়ার পর তেহরানের রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে পড়েছিল। বাস, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবই ছিল বন্ধ। তবে এখন মানুষ গ্রাম থেকে শহরে ফিরতে শুরু করেছে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই গণপরিবহন ও জনজীবনে স্বাভাবিকতা ফিরে আসছে।

এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইরান কেবল একটি আগ্রাসী শক্তি নয়, বরং আত্মরক্ষার অধিকার সংরক্ষণকারী একটি প্রতিনিয়ত পরিণত ও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অন্যদিকে, সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে ইসরায়েলের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করতে পারে।

আরও খবর

Sponsered content