জাতীয়

ক্ষণিকের দেখায় এক অনন্য নিঃস্বার্থ বন্ধন

  প্রতিনিধি ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৭:১১:৫৭ প্রিন্ট সংস্করণ

রোদ, বৃষ্টি কিংবা গভীর রাত, যাই হোক না কেন, প্রতিদিনই দুটি নির্দিষ্ট সময়ে কিছু মানুষ একটা জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন একজন মানুষকে দেখার অপেক্ষায়। তার গাড়ি কখন এই পথ দিয়ে যাবে ঠিক জানা নেই, তবুও প্রতিদিনের আসা যাওয়ার রুটিন মাথায় রেখে তারা সকাল ও রাতে তাদের সেই কাঙিক্ষত মানুষটিকে দেখার প্রতীক্ষায় থাকেন। আর সেই মানুষটি হলেন বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের নয়নমণি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

কেউ প্রথম দিন থেকেই অফিসে যাওয়ার পথে দাঁড়িয়ে থাকেন। আবার কেউ খুঁজে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াতের পথ। রিকশার হ্যান্ডেলে হাত রেখে কেউ দাঁড়িয়ে থাকেন, কেউ দোকানের সামনে, কেউবা ফুটপাতের ব্যস্ততা থামিয়ে। তাদের অপেক্ষা সেই কাঙ্ক্ষিত ক্ষণটির জন্য, গাড়ির ভেতরে থাকা মানুষটিকে একবার চোখের দেখা দেখবেন বলে।

দিনের পর দিন একই জায়গায় দাঁড়ানো এই মানুষগুলো এখন প্রধানমন্ত্রীরও চেনা মুখ। গাড়িবহর সেই জায়গাগুলোয় পৌঁছালে গতি একটু ধীর হয়। রাস্তার পাশ থেকে হাত নাড়িয়ে শুভেচ্ছা জানান তারা। গাড়ির ভেতর থেকেও প্রধানমন্ত্রী হাত উঠিয়ে সাড়া দেন হাসিমুখে।

রমনা থানার পাশে যমুনা ব্যাংকের একটি এটিএম বুথে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন পাবনার এক বৃদ্ধ। প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় হাতে ধানের শীষ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখে, হাত নেড়ে অভিবাদন জানিয়ে তারপর নাশতা সেরে কাজে যোগ দিতেন।

এখন এটিএম বুথটি স্থায়ীভাবে বন্ধ। চাকরিটিও আর নেই তার। তবু প্রতিদিন সিকিউরিটি গার্ডের সেই ইউনিফর্ম পরে, হাতে ধানের শীষ নিয়ে তিনি চলে আসেন পুরোনো জায়গাটিতে। দাঁড়িয়ে থাকেন প্রধানমন্ত্রীকে দেখার অপেক্ষায়।

একসময় গাড়িবহরটি সামনে আসে। কয়েক সেকেন্ডের দেখা। এই কয়েক মুহূর্তের জন্যই তার এত দীর্ঘ প্রতীক্ষা। দেখা হওয়ার পর মনে একরাশ প্রশান্তি নিয়ে নাশতা সারেন তিনি। পরে সেই বৃদ্ধ চলে যান নিজ গন্তব্যে।

এ যেন পথের পাশে অপেক্ষমাণ মানুষ আর চলন্ত গাড়ির ভেতরের মানুষটির মধ্যে গড়ে ওঠা এক অকৃত্রিম ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।

প্রধানমন্ত্রীর যাওয়ার পথে বনানীর দুবাই মার্কেটের কাছে নিয়মিত অপেক্ষা করেন দুজন রিকশাচালক। প্রতিদিনের জীবিকার ব্যস্ততার মধ্যেও প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি যাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন তারা। গাড়ি কাছাকাছি এলে চোখের ভাষায় খেলে যায় এক আবেগময় মুহূর্ত। এ যেন অপেক্ষা আর চোখের দেখায় গড়ে ওঠা হৃদয়ের সংযোগ।

বনানী কাঁচাবাজারের কাছেও আছে কিছু পরিচিত মুখ। ফুল ও ফল বিক্রেতাদের কেউ কেউ প্রতিদিন অপেক্ষা করেন। ফুটপাতের হকারদের মধ্যেও আছেন এমন অনেকে। কাজ থামিয়ে সেই মুহূর্তের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকেন, গাড়ির ভেতরে থাকা প্রিয় মানুষটিকে একবার দেখবেন বলে।

অন্ধকার রাতে কামাল আতাতুর্ক রোডে একজন অপেক্ষা করেন প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি ফেরার পথে। কখনো সেই অপেক্ষা গড়িয়ে যায় গভীর রাত পর্যন্ত। নাম জানা নেই, কিন্তু দিনের পর দিন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকায় মুখটি আর অপরিচিত থাকেনি। রাতে সেখানে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির গতি একটু ধীর হয়। গাড়ির ভেতরের আলো জ্বালিয়ে হাত নেড়ে অপেক্ষমাণ মানুষটির অভিবাদনের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।

কাজ শেষে রাতে প্রধানমন্ত্রী যখন ফেরেন, গুলশান ২-এর প্রধান সড়ক থেকে গলির ভেতরের রেস্তোরাঁ ও হোটেলের অনেক কর্মচারী তখন অপেক্ষায় থাকেন। তাদের কাছাকাছি পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী নিজেই গাড়ির ভেতরের বাতি জ্বালিয়ে দেন, যেন পথের ধারে অপেক্ষমাণ মানুষগুলো তাকে স্পষ্ট দেখতে পান। আলো জ্বলে উঠতেই চেনা মুখগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দ। কেউ হাত নাড়েন, কেউ অপলক চেয়ে থাকেন। চলন্ত গাড়ির ভেতর থেকে প্রধানমন্ত্রীও হাত তুলে অভিবাদনের জবাব দেন। কথাহীন সেই অভিবাদনেই বিনিময় হয়ে যায় অনেক না-বলা কথা।

পুরো ঘটনাটা মাত্র কয়েক মুহূর্তের। গাড়ি থামে না, কাছে এসে কুশল বিনিময় হয় না, কথাও হয় না। তবু দিনের পর দিন এই ক্ষণিক দেখাতেই গড়ে উঠেছে এক অদ্ভুত মায়ার সম্পর্ক।

শুরুর দিকে অপেক্ষাটা ছিল শুধু পথের পাশের মানুষগুলোর। তারা জানতেন, এই পথ দিয়েই প্রধানমন্ত্রী যাবেন। তাই কাজের ফাঁকে কেউ এসে দাঁড়াতেন রাস্তার ধারে, কেউ অপেক্ষা করতেন শুধু একঝলক প্রিয় প্রধানমন্ত্রীকে দেখবেন বলে।

একসময় সেই অপেক্ষা আর একপক্ষের থাকেনি। পরিচিত জায়গাগুলো কাছে এলে প্রধানমন্ত্রীও খুঁজে ফেরেন মানুষগুলোকে। সেই চেনা মুখগুলো কি আজও দাঁড়িয়ে আছেন পথের ধারে?

এই সম্পর্কের কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই। কোনো মঞ্চ নেই, নেই বক্তৃতা কিংবা করতালির আয়োজন। আছে শুধু অপেক্ষা, পরিচিত কিছু মুখ আর পরস্পরকে খুঁজে নেওয়ার এক নীরব টান।

এ যেন অদৃশ্য এক সুতোয় গাঁথা ভালোবাসার মালা। একদিকে পথের ধারে অপেক্ষমাণ সেইসব মানুষ, অন্যদিকে চলন্ত গাড়ির ভেতর থেকে তাদের খুঁজে ফেরা প্রধানমন্ত্রী। মাঝখানে কয়েক হাতের দূরত্ব, কয়েক মুহূর্তের দেখা—তবু সেই ক্ষণিকের মধ্যেই গড়ে উঠেছে এক নীরব বন্ধন।

আরও খবর

Sponsered content