প্রতিনিধি ১৪ আগস্ট ২০২৬ , ৩:২৪:৩১ প্রিন্ট সংস্করণ
মহাবিশ্বে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এক মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছেন একদল জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তাদের ধারণা, এটি একই সঙ্গে নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল এবং ব্ল্যাক হোলের মতো বিপুল শক্তি নির্গত করে। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ‘ব্ল্যাক হোল স্টার’ বা ‘কৃষ্ণগহ্বর নক্ষত্র’।
আন্তর্জাতিক গবেষক দলটি নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপে ধারণ করা প্রাচীন মহাবিশ্বের ছবিতে থাকা একটি রহস্যময় লাল বিন্দু বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এই সম্ভাব্য নতুন বস্তুর সন্ধান পাওয়া গেছে বলে বার্তাসংস্থা দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়। ‘এমওএম-বিএইচ*-ওয়ান’ নামের বস্তুটি পৃথিবী থেকে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে ‘সিটাস’ বা তিমি নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত।
গবেষকদের ধারণা, বস্তুটি মহাবিস্ফোরণের (বিগ ব্যাং) মাত্র ৬৬ কোটি বছর পর গঠিত হয়েছিল। অর্থাৎ জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে আমরা বস্তুটিকে মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর দিকের অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি।
বস্তুটির আকার পুরো সৌরজগতের সমান বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেখতে এটি বিশাল একটি নক্ষত্রের মতো হলেও এর শক্তি নির্গমনের ধরন প্রচলিত কোনো নক্ষত্রের সঙ্গে মেলে না। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এটি পরিচিত যেকোনো নক্ষত্রের তুলনায় প্রায় ১০ হাজার কোটি গুণ বেশি শক্তি নির্গত করে। এর শক্তি উৎপাদনের মাত্রা বরং ব্ল্যাক হোল থেকে পাওয়া শক্তির কাছাকাছি।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) কাভলি ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোফিজিকস অ্যান্ড স্পেস রিসার্চে থাকাকালে গবেষণাটির নেতৃত্ব দেওয়া ড. রোহান নাইডু বলেন, তারা নতুন ধরনের একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তু শনাক্ত করেছেন, যা ব্ল্যাক হোলের মতো শক্তি নির্গত করলেও একই সঙ্গে নক্ষত্রের বৈশিষ্ট্য বহন করে। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াইয়ে কর্মরত।
গবেষণাটি বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকরা মূলত জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহার করে মহাবিশ্বের সবচেয়ে দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর সন্ধান করছিলেন। এর আগে তারা এমওএম-জেড১৪ নামের একটি গ্যালাক্সি শনাক্ত করেন, যা বিগ ব্যাংয়ের মাত্র ২৮ কোটি বছর পর গঠিত হয়েছিল। এরপর আরও কিছু রহস্যময় মহাজাগতিক বস্তুর দিকে নজর দেন তারা।
এ সময় টেলিস্কোপের ছবিতে অত্যন্ত উজ্জ্বল ও অস্বাভাবিক লাল একটি বিন্দু তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।‘এমওএম-বিএইচ*-ওয়ান’ নামের ওই বস্তুটি টেলিস্কোপের আর্কাইভে থাকা সবচেয়ে লাল বস্তু হিসেবে চিহ্নিত হয়।
ড. নাইডুর মতে, বস্তুটির আলো প্রায় সম্পূর্ণ লাল এবং একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের নিচে গিয়ে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়। পরিচিত কোনো ধরনের মহাজাগতিক বস্তুর আলোর সঙ্গে এর এমন আচরণের তুলনা করা যায় না।
কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে গবেষকরা ধারণা করছেন, এটি আসলে পারমাণবিক সংযোজনের মাধ্যমে শক্তি উৎপাদনকারী বিশাল কোনো নক্ষত্র নয়। বরং এটি একটি ব্ল্যাক হোল, যাকে অত্যন্ত ঘন গ্যাসের বিশাল মেঘ চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। সেই গ্যাসের আবরণ থেকেই নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল আলো নির্গত হচ্ছে।
গবেষকদের এই ব্যাখ্যা সঠিক হলে, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের ছবিতে প্রায়ই দেখা যাওয়া রহস্যময় ‘লিটল রেড ডট’ বা ছোট লাল বিন্দুগুলোর অনেকগুলোই একই ধরনের ‘ব্ল্যাক হোল স্টার’ হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্ল্যাক হোল ও গ্যালাক্সির বিবর্তন সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতে পারে। ড. নাইডুর ধারণা, ব্ল্যাক হোল স্টারগুলোই হয়তো বর্তমান সময়ের সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের প্রাথমিক বীজ হিসেবে কাজ করেছে।
মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গাসহ প্রায় সব বড় গ্যালাক্সির কেন্দ্রে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল রয়েছে। এসব ব্ল্যাক হোল গ্যালাক্সির বিবর্তন ও সেখানে নক্ষত্র তৈরির প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
নাইডুর মতে, ব্ল্যাক হোল স্টারগুলো হয়তো ঠিক সেই পর্যায়কে প্রতিনিধিত্ব করে, যখন সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এগুলো কখন নক্ষত্র তৈরি হবে বা নক্ষত্র তৈরির প্রক্রিয়া কখন থেমে যাবে, তা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখতে পারে।
আর নক্ষত্র গঠনের ওপর এই প্রভাব শেষ পর্যন্ত গ্রহের জন্ম, জীবনের বিকাশ এবং বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভবের মতো মহাজাগতিক ঘটনাগুলোর গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
তবে ‘ব্ল্যাক হোল স্টার’ এখনো একটি বৈজ্ঞানিক ধারণা বা সম্ভাব্য নতুন শ্রেণির বস্তু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর প্রকৃতি নিশ্চিত করতে আরও পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন। যদি ভবিষ্যৎ গবেষণায় ধারণাটি নিশ্চিত হয়, তাহলে মহাবিশ্বের প্রথম দিকের ব্ল্যাক হোল কীভাবে তৈরি হয়েছিল এবং কীভাবে তারা পরবর্তীতে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়েছে সে বিষয়ে বিজ্ঞানের দীর্ঘদিনের একটি রহস্যের নতুন ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে।













