প্রতিনিধি ৩ অক্টোবর ২০২৬ , ২:০৫:০২ প্রিন্ট সংস্করণ
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীদের দুর্বিষহ জীবন, যুদ্ধের অভিঘাত ও মানবিক বিপর্যয়ের স্মৃতি উঠে এলো গীতি আলেখ্য ‘যশোর রোড’-এ। মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ অবলম্বনে নির্মিত এই গীতি আলেখ্য পরিবেশন করেছে নরসিংদীর নাট্যদল ‘বাঁধনহারা’। গতকাল সন্ধ্যায় ধানমন্ডির ছায়ানট মিলনায়তনে ‘২৭ ধানমন্ডি গাই বাংলার গান পর্ষদ’র উদ্যোগে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক বেদনাবহ অধ্যায়- দেশ ছেড়ে শরণার্থী হয়ে সীমান্ত পাড়ি দেওয়া মানুষের জীবন ও দুর্ভোগকে কেন্দ্র করে সাজানো হয় পুরো আয়োজন। অনুষ্ঠানের শুরুতে ছিল সূচনা ও শুভেচ্ছা বিনিময়। এরপর মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে স্বাগত বক্তব্য দেন ২৭ ধানমন্ডি গাই বাংলার গান পরিষদের ফজলুল কবীর তুহিন।
স্বাগত বক্তব্যে ফজলুল কবীর তুহিন বলেন, ‘১৯৭১ সালে তৎকালীন আমেরিকান সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু আমেরিকার জনগণ আমাদের পাশে ছিল। তার প্রমাণ অ্যালেন গিন্সবার্গ ও তার এই অমর সৃষ্টি ‘যশোর রোড’। শুধু তাই নয়, আমেরিকার ম্যাডিসন স্কয়ারে কনসার্ট ফর বাংলাদেশও প্রমাণ করে আমেরিকার জনগণের মতের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিল তৎকালীন সরকার। সরকার যদি জনগণের বিপক্ষে দাঁড়ায়, তার ফলাফল কখনো ইতিবাচক হতে পারে না। বাঁধনহারাকে ধন্যবাদ, আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের স্মারক হিসেবে এ গীতি আলেখ্য মঞ্চস্থ করায়।’
অনুষ্ঠানে শরণার্থী শিবিরের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা রাজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা সত্যজিৎ মজুমদার। আরও বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মুক্তিযোদ্ধা ড. সারোয়ার আলী ও ডাকসুর সাবেক জিএস মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব জামান। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার শরণার্থী জীবনের দুঃখ-কষ্টের স্মৃতিচারণের মধ্যদিয়ে উঠে আসে ইতিহাসের সেই বেদনাময় অধ্যায়ের নানা অনুষঙ্গ।
আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘শেপ্তেম্বের ওন জেস্সরে ড়আদ’ কবিতার ইংরেজি আবৃত্তি। এটি আবৃত্তি করেন নামধন্য আবৃত্তিশিল্পী বেলায়েত হোসেন। এরপর কবিতাটির বাংলা অনুবাদ আবৃত্তি করেন আবৃত্তিশিল্পী রেজিনা ওয়ালী লীনা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় দেশাত্মবোধক সংগীত। ‘ও আমার দেশের মাটি’ পরিবেশন করেন সংগীতশিল্পী আবিদা সুলতানা সেতু এবং ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ পরিবেশন করেন আমন্ত্রিত সংগীতশিল্পী। কবিতা, স্মৃতিচারণ ও সংগীতের মধ্যদিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার মানবিক বাস্তবতাকে দর্শকের সামনে তুলে ধরা হয়।
বিরতির পর শুরু হয় সন্ধ্যার মূল আকর্ষণ গীতি আলেখ্য ‘যশোর রোড’। অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতা অবলম্বনে নির্মিত এই পরিবেশনার নির্দেশনায় ছিলেন কামজ্জামান তাপু। নরসিংদীর নাট্যদল ‘বাঁধনহারা’ ৩৫ মিনিটের এই গীতি আলেখ্য পরিবেশন করে।
‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ মূলত মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের শরণার্থীদের দুর্দশার এক শক্তিশালী মানবিক দলিল। সেই কবিতাকে গীতি আলেখ্যের ভাষায় মঞ্চে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে আয়োজনটি শুধু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স্মরণ নয়, সেই সময়ের সাধারণ মানুষের বেদনা ও বাস্তবতাকেও নতুন করে সামনে আনার প্রয়াস নিয়েছে।
প্রায় ৯০ মিনিটের আয়োজনে আলোচনা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ, কবিতা আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গান এবং গীতি আলেখ্য- সব মিলিয়ে সাজানো হয় অনুষ্ঠানটি।
আয়োজক সংগঠন ‘২৭ ধানমন্ডি গাই বাংলার গান পর্ষদ’ জানায়, ধানমন্ডি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে শুধু আনুষ্ঠানিক স্মরণে সীমাবদ্ধ না রেখে কবিতা, সংগীত ও নাট্যভাষায় নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার যে প্রয়াস ‘যশোর রোড’র মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে, সেটিই আয়োজনটির অন্যতম তাৎপর্য। বিশেষ করে অ্যালেন গিন্সবার্গের বহুল আলোচিত কবিতাকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও শরণার্থী জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মঞ্চে উপস্থাপনের মধ্যদিয়ে ইতিহাসের একটি বেদনাময় অধ্যায়কে নতুন করে স্মরণ করা হয়।















