প্রতিনিধি ২৯ জুন ২০২৬ , ৮:০১:১৫ প্রিন্ট সংস্করণ
উজবেকিস্তানকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়ায় দারুণ উচ্ছ্বসিত ডিআর কঙ্গোর ফুটবলাররা। এই বিশ্বকাপের অন্যতম বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়েছে কেপ ভার্দে। প্রায় পাদপ্রদীপের বাইরে থাকা এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই সরাসরি নকআউটে পা রেখেছে। শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে তাদের সামনে এখন লিওনেল মেসির বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। কেপ ভার্দের এই রূপকথা আফ্রিকান ফুটবলের সামগ্রিক সাফল্যেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০২৬ বিশ্বকাপে আফ্রিকা মহাদেশের ফুটবলের যে নবজাগরণ ও আত্মপ্রকাশ ঘটেছে, তা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
৪৮ দলের এই বিশ্বকাপে এবার রেকর্ড ১০টি আফ্রিকান দেশ অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। গ্রুপপর্ব শেষ হওয়ার আগেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে আফ্রিকা মহাদেশের উত্থান ঘটছে। অংশ নেওয়া ১০টি দেশের মধ্যে নয়টিই শেষ ৩২-এ জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছে। স্পেন, ইংল্যান্ড, পর্তুগাল বা ব্রাজিলের মতো বিশ্ব পরাশক্তিরাও এবার আফ্রিকান প্রতিপক্ষের সামনে হোঁচট খেয়েছে। মরক্কো থেকে শুরু করে কেপ ভার্দে—প্রতিটি দলই বিশ্বমঞ্চে নিজেদের নতুন পরিচয় তুলে ধরেছে।
কেপ ভার্দের এই রূপকথা ফিফার জন্যও বড় স্বস্তির কারণ হয়েছে। ৩২ থেকে ৪৮ দলে বিশ্বকাপ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক সমালোচনা ছিল, যেখানে অভিযোগ তোলা হয়েছিল কেবল রাজস্ব বাড়ানোর জন্য দলসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। তবে কেপ ভার্দের মতো দলের সাফল্য সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি তৈরি করেছে। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠা ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট দেশ হলো কেপ ভার্দে, যাদের জনসংখ্যা পাঁচ লাখের কিছু বেশি। টুর্নামেন্টের অভিষেক ম্যাচেই তারা শক্তিশালী স্পেনকে রুখে দিয়ে চমক সৃষ্টি করে। দলের ৪০ বছর বয়সি গোলরক্ষক ভোজিনিয়া স্পেনের বিপক্ষে দুর্দান্ত ম্যাচসেরা পারফরম্যান্স দেখিয়ে রাতারাতি ইন্টারনেট সেনসেশনে পরিণত হন; তার ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা এক কোটি ৭০ লাখে পৌঁছেছে। উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের সঙ্গে ড্র করে দলটি তাদের গ্রুপ থেকে বিদায় নিশ্চিত করেছে। আলজেরিয়ার তারকা রিয়াদ মাহরেজ মনে করেন, আফ্রিকার এই সাফল্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি আফ্রিকান ফুটবলের মান ও উন্নয়নের স্পষ্ট প্রমাণ।
ডিআর কঙ্গোর কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাব্রেও একই সুর প্রকাশ করেছেন। তিনি গত ১৫ বছরে আফ্রিকার ফুটবল কাঠামো, কোচিং পদ্ধতি ও খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়ায় যে ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে, সেটিকে এই সাফল্যের মূল ভিত্তি হিসেবে দেখছেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস, আফ্রিকার কোনো দেশের বিশ্বকাপ জেতা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। এই আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে মরক্কো। ২০২২ বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে সেমিফাইনালে ওঠা দলটি এবারও নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করেছে। ব্রাজিলের বিপক্ষে ১-১ ড্র করা ম্যাচে দীর্ঘ সময় আধিপত্য বজায় রেখেছিল ‘অ্যাটলাস লায়ন্স’রা। শেষ ৩২-এ নেদারল্যান্ডসের মতো কঠিন প্রতিপক্ষ পেলেও দলটির কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি জয়ের লক্ষ্য নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। তিনি জানান, মরক্কো এখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং তাদের এই লক্ষ্য পূরণ সম্ভব।
আফ্রিকার সাফল্য প্রমাণ করেছে যে সুযোগ পেলে নতুন শক্তিরাও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম। তবে এই মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। এশিয়ার নয়টি দেশের মধ্যে কেবল জাপান ও অস্ট্রেলিয়া নকআউট পর্বে উঠতে পেরেছে। জর্ডান ও উজবেকিস্তান কোনো পয়েন্ট ছাড়াই বিদায় নিয়েছে, এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কুরাসাও, হাইতি ও পানামাও জয়শূন্য অবস্থায় টুর্নামেন্ট শেষ করেছে। তবুও, বিশ্বকাপের এই অধ্যায়ে সবচেয়ে উজ্জ্বল নামটি আফ্রিকা। একসময় যাদের সাফল্য ছিল বিস্ময়ের বিষয়, তারা এখন নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। আফ্রিকানদের এই উত্থান এখন এতটাই বাস্তব যে, তারা নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার মতো পরাশক্তির মুখোমুখি হচ্ছে।




















