আন্তর্জাতিক

মারা গেছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র লিন্ডসে গ্রাহাম

  প্রতিনিধি ১৩ জুলাই ২০২৬ , ১:১৫:০৯ প্রিন্ট সংস্করণ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সিনেটর এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র লিন্ডসে গ্রাহাম আর নেই। ৭১ বছর বয়সে শনিবার সন্ধ্যায় আকস্মিক অসুস্থতার পর তিনি মারা যান। তার কার্যালয় এক বিবৃতিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

প্রাথমিক ময়নাতদন্তের তথ্যে জানা গেছে, হৃদ্‌যন্ত্রের প্রধান ধমনি অ্যাওর্টা ফেটে যাওয়ায় তার মৃত্যু হয়েছে। বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

মাত্র একদিন আগেই গ্রাহাম ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ সফর করেন। সেখানে তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। সফরের আগে তার কোনো শারীরিক অসুস্থতার খবর জানা যায়নি।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে বলেন, মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও তিনি গ্রাহামের সঙ্গে কথা বলেছেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি দারুণ স্বাভাবিক ছিলেন, যদিও কিছুটা ক্লান্ত শোনাচ্ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ়চেতা মানুষ। নিজের অবস্থানকে সঠিক মনে করলে বিরোধিতার মুখেও অনড় থাকতেন। তিনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন।’

পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করে ট্রাম্প গ্রাহামকে ‘একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক’ উল্লেখ করেন এবং বলেন, তাকে গভীরভাবে স্মরণ করা হবে।

 

সমালোচক থেকে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী

২০০২ সালে সাউথ ক্যারোলিনা থেকে সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার পর গ্রাহাম যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠে পরিণত হন।

তবে ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক সবসময় এমন ছিল না। ২০১৫ সালে তিনি ট্রাম্পকে বর্ণবিদ্বেষ উসকে দেওয়া, বিদেশিবিদ্বেষী ও ধর্মীয় কট্টরপন্থী বলে সমালোচনা করেছিলেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনের আগে তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আমরা যদি ট্রাম্পকে মনোনয়ন দিই, তাহলে ভয়াবহভাবে হারব এবং সেটাই আমাদের প্রাপ্য হবে।’

এমনকি ২০২১ সালে ক্যাপিটল হিলে হামলার পর গ্রাহাম সিনেটে বলেছিলেন, ‘ট্রাম্পের সঙ্গে আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা ছিল। কিন্তু এভাবে এর শেষ হওয়া আমি চাইনি। আমার জন্য এখানেই যথেষ্ট।’

তবে সময়ের সঙ্গে তার অবস্থান বদলে যায়। ২০২১ সালের অভিশংসন বিচারে তিনি ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করার বিপক্ষে ভোট দেন এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানান।

গ্রাহামের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, ইরানের সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার সিদ্ধান্ত এবং রক্ষণশীল বিচারপতি নিয়োগ এসব কারণে ট্রাম্পের নীতির প্রতি তার আস্থা তৈরি হয়েছিল।

 

পররাষ্ট্রনীতিতে কঠোর অবস্থান

লিন্ডসে গ্রাহাম দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপপন্থী রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ইসরায়েলের প্রতি তার অকুণ্ঠ সমর্থন এবং ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণে তিনি ব্যাপক আলোচিত ছিলেন।

গত মাসে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত না মানলে ইরানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হবে। এটিই ছিল তার শেষ দিকের টেলিভিশন সাক্ষাৎকারগুলোর একটি।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শোকবার্তায় বলেন, ‘লিন্ডসে বুঝতেন যে ইসরায়েল ও আমেরিকার নিরাপত্তা অবিচ্ছেদ্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইসরায়েল তার সবচেয়ে বড় বন্ধুদের একজনকে হারিয়েছে।’

গ্রাহাম ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর ইরাকে সামরিক অভিযানের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারেরও তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি তখন বলেছিলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য দুঃখজনক ও বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত এবং এতে বিশ্বজুড়ে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো উৎসাহিত হবে।

ইউক্রেনের প্রতি সামরিক সহায়তা এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞারও তিনি ছিলেন জোরালো সমর্থক। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি গভীরভাবে শোকাহত। যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব একজন দৃঢ়চেতা নেতাকে হারিয়েছে।’

 

ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

গ্রাহামের ব্যক্তিগত জীবনও ছিল সংগ্রামময়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে তিনি মা ও বাবাকে হারান। এরপর তিনি তার ছোট বোনের দায়িত্ব নেন এবং পরবর্তীতে আইনগতভাবে তাকে দত্তক গ্রহণ করেন।

আইনের ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি মার্কিন বিমানবাহিনীতে সামরিক প্রসিকিউটর ও প্রতিরক্ষা আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ২০০২ সালে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত হন।

তার মৃত্যুতে সাউথ ক্যারোলিনার গভর্নর হেনরি ম্যাকমাস্টার বর্তমান মেয়াদের বাকি সময়ের জন্য একজন অস্থায়ী সিনেটর নিয়োগের ক্ষমতা পেয়েছেন। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে (মিডটার্ম) গ্রাহামের স্থায়ী উত্তরসূরি নির্বাচিত হবেন।

গ্রাহামের মৃত্যুর আগে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ছিল ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে উভয় দলই জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এদিকে একই সময়ে রিপাবলিকান দলের আরেক সিনেটর, কেন্টাকির মিচ ম্যাককনেলও অজ্ঞাত এক শারীরিক সমস্যার কারণে কয়েক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে এখন পর্যন্ত বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

আরও খবর

Sponsered content