আন্তর্জাতিক

ভয়ের রাজনীতি থামাতে পারেনি এল-সায়েদের ঐতিহাসিক সিনেট জয়

  প্রতিনিধি ৫ নভেম্বর ২০২৬ , ২:৪২:৫৭ প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে বারবার ‘জিহাদি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী তার দেশপ্রেম ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এমনকি নির্বাচনী প্রচারণায় বিতরণ করা প্রচারপত্রে তাকে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যুক্ত করে অভিযোগ করা হয়েছে, নির্বাচিত হলে তিনি মিশিগানে শরিয়াহ আইন চালু করবেন।

এত কিছুর পরও সব বাধা পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ। তার এই জয়কে দেশটিতে ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণার বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখা হচ্ছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ের পর দেওয়া বক্তব্যে ৪২ বছর বয়সী এল-সায়েদ তার প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের প্রচারণাকে ইতিহাসের অন্যতম কুৎসিত ও বিদ্বেষনির্ভর প্রচারণা বলে অভিহিত করেন।

তিনি বলেন, ‘আপনারা ঘৃণাকে বেছে নিয়েছিলেন, আর মিশিগান বেছে নিয়েছে আশাকে।’

এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ইতিহাস গড়েছেন মিশিগানে জন্ম নেওয়া মিসরীয় বংশোদ্ভূত এল-সায়েদ। তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রিধারী এবং এর আগে ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি।

তবে নির্বাচনী লড়াইয়ে তার ধর্মীয় পরিচয়ই বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ আরব-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল ডিয়ারবর্ন ও আশপাশের এলাকায় এই প্রচারণা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করে।

ট্রাম্প সরাসরি এল-সায়েদকে সন্ত্রাসী আখ্যা দেন এবং ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলাকারীদের সঙ্গে তার তুলনা করেন। এ ছাড়া লুইজিয়ানার রিপাবলিকান সিনেটর জন কেনেডি বলেন, এল-সায়েদ ‘বিন লাদেনের জার্সি পরে ঘুমান’। টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ তাকে ‘জিহাদি লেপ্রিকন’ বলে কটাক্ষ করেন এবং তিনি নির্বাচিত হলে মার্কিন নাগরিকদের প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও রাজনীতি, বর্ণ এবং ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে গবেষক নাজিতা লাজেভার্দি বলেন, প্রচারণাটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক ছিল রিপাবলিকান দলের শীর্ষ নেতাদের প্রকাশ্যে এসব বক্তব্যে সমর্থন দেওয়া।

তার ভাষায়, ‘এটি আমার দেখা সবচেয়ে গুরুতর ও ইসলামবিদ্বেষী নির্বাচনী প্রচারণা।’

রিপাবলিকানরা এল-সায়েদকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত করারও চেষ্টা করেন। এ জন্য মিসরের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে এক দশক আগের তার কিছু লেখা এবং তার সৎবোনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট সামনে আনা হয়। তবে এল-সায়েদ মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। তার সঙ্গে সংগঠনটির সম্পর্কের কোনো প্রমাণও সামনে আসেনি।

গত মার্চে মিশিগানের টেম্পল ইসরায়েল সিনাগগে হামলার পর এল-সায়েদের দেওয়া একটি বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। হামলার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আঘাতপ্রাপ্ত মানুষ অন্যকে আঘাত করে।’ তার এই মন্তব্যকে কিছু ইহুদি নেতা ইহুদিবিদ্বেষী সহিংসতার যৌক্তিকতা দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখেন। পরে এল-সায়েদ দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, তার বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা হয়ে থাকতে পারে এবং ওই সময় প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ ছিল না।

নির্বাচনের আগের দিনও রিপাবলিকানরা বিষয়টি প্রচারণায় ব্যবহার করেন। মিশিগান রিপাবলিকান পার্টির এক সংবাদ সম্মেলনে এল-সায়েদের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার’ অভিযোগসংবলিত বড় লাল ব্যানার প্রদর্শন করা হয়।

তবে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা অধিকাংশ ভোটার এসব আক্রমণকে মরিয়া প্রচারণা এবং অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা হিসেবে দেখেছেন। ডেট্রয়েট এলাকার প্রায় ৩০ জন ভোটারের সাক্ষাৎকারে মাত্র পাঁচজন জানিয়েছেন, এল-সায়েদের মুসলিম পরিচয় কিংবা উগ্রপন্থীদের সঙ্গে তার কথিত সম্পর্ক তাদের রজার্সকে ভোট দিতে প্রভাবিত করেছে।

৭৩ বছর বয়সী ভোটার রবিন কুক বলেন, ‘আমি মনে করি না তিনি প্রকৃত আমেরিকান। আমি তাকে বিশ্বাস করি না।’

অন্যদিকে, এল-সায়েদের সমর্থকরা বলেছেন, ধর্মীয় পরিচয় কোনো ব্যক্তির যোগ্যতা বা দেশপ্রেম নির্ধারণ করতে পারে না। ৭২ বছর বয়সী ক্যাথলিক ভোটার পামেলা জনসন বলেন, ‘আমি সব ধরনের মানুষের মধ্যে বড় হয়েছি। আমাদের সবারই গুরুত্ব আছে, গায়ের রং, বর্ণ বা অন্য পরিচয় যা-ই হোক না কেন।’

ডিয়ারবর্নের ব্যবসায়ী ও ইয়েমেন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হওয়া ৪৯ বছর বয়সী ইমাদ সুফি জানান, ট্রাম্প এল-সায়েদকে আক্রমণ শুরু করার পর থেকে এলাকায় মুসলিমবিরোধী মনোভাব বেড়েছে। বিশেষ করে প্রকাশ্যে হিজাব পরা নারীদের উদ্দেশে বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের ঘটনা বেড়েছে বলে তিনি জানান।

তিনবার ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া সুফি বলেন, রজার্স যদি ট্রাম্পের মুসলিমবিরোধী বক্তব্য থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন, তাহলে তিনি তাকে সমর্থন করতে পারতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি এল-সায়েদকেই ভোট দিয়েছেন।

মিশিগান অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য আলাবাস ফারহাত বলেন, নির্বাচনী প্রচারণায় আরব-আমেরিকান ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের পুরোনো বিদ্বেষমূলক বক্তব্য আবার সামনে আনা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘একজন মুসলিম কতটা আমেরিকান হতে পারেন, একজন আরব-আমেরিকান কতটা আমেরিকান হতে পারেন এ প্রশ্ন বারবার তোলা হয়। এমনটা ঘটে, কিন্তু বারবারই আমরা প্রমাণ করি যে আমরাও সমানভাবে আমেরিকান।’

এল-সায়েদের এই জয় তাই শুধু একটি নির্বাচনী বিজয় নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয়, অভিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণার বিরুদ্ধে ভোটারদের অবস্থানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আরও খবর

Sponsered content