আন্তর্জাতিক

ট্রাম্প-নেতানিয়াহু দূরত্ব বাড়ছে

  প্রতিনিধি ১৬ জুন ২০২৬ , ১১:১২:৩৭ প্রিন্ট সংস্করণ

ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে গড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠ জোটকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার ও যৌথ সামরিক চাপের মাধ্যমে ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরির ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আশায় জল ঢেলে দিয়েছে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি।

এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে এখন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন সংঘাত থেকে বেরিয়ে এসে কূটনৈতিক সমাধানের পথে এগোতে চাইছে, তখন ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই চুক্তিকে নিজেদের নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘এই চুক্তি ইসরায়েলের জন্য ভয়াবহ। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সেনাপ্রধান পর্যন্ত নেতৃত্বের মধ্যে এমন কেউ নেই, যিনি এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন।’

মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, আগামী ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময় তারা ইরানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ চুক্তির শর্ত নিয়ে আলোচনা করবে। বিশেষ করে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উদ্বেগ দূর করার চেষ্টা করা হবে।

তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, আলোচনার মেয়াদ আরও বাড়তে পারে। এতে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে, অথচ তাদের মূল উদ্বেগগুলোর সমাধান অনিশ্চিতই থেকে যাবে।

ইসরায়েল সমর্থিত সামরিক অভিযান ও লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে হামলার বিষয়েও ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে একাধিকবার মতবিরোধ হয়েছে।

মাসের শুরুতে ট্রাম্প এক টেলিফোন আলাপে নেতানিয়াহুকে বৈরুতে হামলা না চালানোর নির্দেশ দেন বলে জানা গেছে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছিল। যদিও ওই দিন হামলা স্থগিত করা হয়েছিল, এক সপ্তাহ পর বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলা নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এর জবাবে ইরান ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে এবং ট্রাম্প প্রকাশ্যে উভয় পক্ষকেই ভর্ৎসনা করেন।

রোববার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্তর্বর্তী চুক্তির ঘোষণা আসার কয়েক ঘণ্টা আগে আবারও বৈরুতে হামলা চালায় ইসরায়েল। লেবানন থেকে ছোড়া রকেটের জবাবে এ হামলা চালানো হয়। তবে ট্রাম্প ওই রকেট হামলাকে ‘ছোট ও তুচ্ছ’ ঘটনা বলে উল্লেখ করেন।

সোমবার জেরুজালেমে সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু স্বীকার করেন যে ট্রাম্পের সঙ্গে তার সব বিষয়ে মতের মিল হয় না। তিনি বলেন, ‘তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, আমি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। অনেক বিষয়ে আমরা একমত হই, আবার কিছু বিষয়ে কম একমত হই। আমি ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থের দায়িত্বে আছি।’

নেতানিয়াহু আরও জানান, ইরানের দাবির মুখেও দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। হিজবুল্লাহর হামলার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের স্বাধীনভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার আছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের কার্যক্রম পরিচালনার স্বাধীনতা এবং উত্তরাঞ্চলের নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখছি।’

শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তির আওতায় সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে।

তবে ইসরায়েলি সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যে দুটি বিষয়কে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন- ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থন বন্ধ করা- সেগুলো বর্তমান আলোচনার এজেন্ডায় নেই।

তিনজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা মনে করছেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ৯০ দিন পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখে বৃহত্তর চুক্তির আলোচনা চালিয়ে যাবে।

ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, গত সপ্তাহে ট্রাম্প যখন প্রথমবারের মতো ইরানের সঙ্গে চুক্তি আসন্ন বলে ঘোষণা দেন, তখন তা ইসরায়েলকে বিস্মিত করে। তারা স্বীকার করেছেন, আলোচনার ওপর প্রভাব বিস্তারে ইসরায়েল তেমন সফল হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অতীতে তিনি বারবার দাবি করেছেন যে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ইসরায়েলের জন্য বড় কূটনৈতিক সুবিধা এনে দিয়েছে।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র জেরুজালেমে দূতাবাস স্থানান্তর করে, আব্রাহাম চুক্তিকে সমর্থন দেয় এবং বারাক ওবামা আমলের ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসে, যা কি না নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি সেই রাজনৈতিক বার্তাকেই দুর্বল করে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আরও খবর

Sponsered content