সারাদেশ

সাপের কামড়ে খেয়ে হাসপাতালের পথে নিভে গেল আদিবাসী কিশোরের জীবনের প্রদীপ

  হুমায়ুন কবির, রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি: ৭ আগস্ট ২০২৬ , ১১:২১:২৭ প্রিন্ট সংস্করণ

একটি বিষধর সাপের ছোবল, তারপর একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত, শেষ পর্যন্ত নিভে গেল একটি তরতাজা প্রাণ। ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় ঘুমন্ত অবস্থায় সাপের কামড়ে রতন পাহান (১৭) নামে এক আদিবাসী কিশোরের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। আধুনিক চিকিৎসার পরিবর্তে কুসংস্কারের আশ্রয় নেওয়ায় মূল্য দিতে হলো একটি সম্ভাবনাময় জীবনের।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) দিবাগত রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে উপজেলার নেকমরদ ইউনিয়নের ঘনশ্যামপুর গ্রামে হৃদয়বিদারক এ ঘটনা ঘটে। নিহত রতন পাহান মুন্ডা সম্প্রদায়ের বাসিন্দা।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাতের খাবার শেষে প্রতিদিনের মতো নিজ ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন রতন। গভীর রাতে হঠাৎ একটি বিষধর সাপ তাকে ছোবল দেয়। তীব্র যন্ত্রণায় ঘুম ভেঙে গেলে তিনি মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়ে সাপটি দেখতে পান এবং আতঙ্কিত কণ্ঠে পরিবারের সদস্যদের ডাক দেন।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই শুরু হয় সময়ের সঙ্গে এক নির্মম লড়াই। হাসপাতালে নেওয়ার পরিবর্তে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় এক কবিরাজের কাছে। সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে ঝাড়ফুঁক। কবিরাজ আশ্বস্ত করেন, রতন সুস্থ হয়ে উঠবে। সেই আশ্বাসে ভরসা করে ভোরে তাকে আবার বাড়িতে ফিরিয়ে আনে পরিবার। কিন্তু বিষ তার শরীরে নীরবে ছড়িয়ে পড়ছিল। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রতনের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। তখন স্বজনরা তাকে দ্রুত রাণীশংকৈল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।কর্তব্যরত চিকিৎসক তার আশঙ্কাজনক অবস্থা দেখে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। কিন্তু ভাগ্য আর সহায় হয়নি। উন্নত চিকিৎসার আশায় হাসপাতালে নেওয়ার পথেই চিরতরে থেমে যায় রতনের জীবন। নেকমরদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, তিনি নিহতের পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন। তিনি বলেন, সচেতনতার অভাবে সময় নষ্ট না করে সরাসরি হাসপাতালে নেওয়া হলে হয়তো রতনের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতো।
গ্রামজুড়ে এখন শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্না আর প্রতিবেশীদের দীর্ঘশ্বাস যেন একটাই প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে “যদি শুরুতেই হাসপাতালে নেওয়া হতো, তবে কি আজও বেঁচে থাকত রতন?”
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপের কামড়ের পর ঝাড়ফুঁক বা ওঝা-কবিরাজের ওপর নির্ভর না করে যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে অ্যান্টিভেনমসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করাই জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। রতনের মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতিই নয়, কুসংস্কারের ভয়াবহ পরিণতিরও এক নির্মম সতর্কবার্তা।

আরও খবর

Sponsered content