প্রতিনিধি ১৮ জুলাই ২০২৬ , ১:০১:১২ প্রিন্ট সংস্করণ
সফল হতে হলে বিরামহীনভাবে কাজ করে যেতে হবে কর্মজীবন সম্পর্কে এমন ধারণা এখনও বেশ প্রচলিত। কিন্তু সব সময় কাজের মধ্যে ডুবে থাকাই যে সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়, তা বলছে গবেষণা। বরং নিয়মিত বিশ্রাম ও পরিকল্পিত ছুটি কর্মীর মানসিক সুস্থতা, সৃজনশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মদক্ষতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক কর্মী প্রয়োজন থাকলেও ছুটি নিতে সংকোচ বোধ করেন। কর্মক্ষেত্রে ছুটি নেওয়াকে অনেক সময় দায়িত্ব এড়িয়ে চলা বা কম পরিশ্রম করার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। অথচ দীর্ঘ সময় বিরতিহীনভাবে কাজ করলে ধীরে ধীরে মানসিক ক্লান্তি তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং কাজের মানের ওপর। একসময় অতিরিক্ত চাপ কর্মীকে বার্নআউটের দিকেও ঠেলে দিতে পারে।
বাড়ছে কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ
আধুনিক কর্মসংস্কৃতিতে দীর্ঘ সময় কাজ করাকে অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে কর্মীদের মধ্যে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা এবং চরম ক্লান্তির প্রবণতা বাড়ছে। ২০২৪ সালের আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে অংশ নেওয়া ৫৩ শতাংশ মানুষ মানসিক চাপ এবং ৪০ শতাংশ ঘুমের সমস্যাকে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। ম্যানেজার ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যেও বার্নআউটের সমস্যা উল্লেখযোগ্য হারে দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কাজের চাপ থেকে নিয়মিত বিরতি নেওয়া এই পরিস্থিতি মোকাবিলার অন্যতম কার্যকর উপায়।
The Importance of Taking Breaks: Increase Your Focus
ছুটির সুফল থাকে দীর্ঘদিন
ছুটির প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়ার ফ্র্যাঙ্কলিন কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের গবেষকেরা ৯টি দেশের ৩২টি গবেষণার ২৫৬টি তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তাদের গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় ‘জার্নাল অব অ্যাপ্লাইড সাইকোলজি’-তে। গবেষণায় দেখা যায়, ছুটিতে যাওয়ার ফলে মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই উপকার শুধু ছুটির দিনগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; কাজে ফিরে আসার পরও এর প্রভাব কর্মদক্ষতা ও মানসিক অবস্থায় দেখা যায়।
বিশ্রাম দরকার মস্তিষ্কেরও
মানুষের মস্তিষ্ককে দীর্ঘ সময় একই ধরনের চাপের মধ্যে রাখলে স্বাভাবিকভাবেই ক্লান্তি জমে। নিয়মিত কাজের চাপে প্রথমদিকে বিষয়টি বোঝা না গেলেও পরে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ছোটখাটো ভুল বাড়তে থাকে এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। কাজ থেকে কয়েক দিনের বিরতি মস্তিষ্ককে পুনরায় শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ দেয়। ফলে কাজে ফেরার পর মনোযোগ, উদ্যম এবং ইতিবাচক মানসিকতা ফিরে পাওয়া সহজ হয়।
বার্নআউটের ঝুঁকি কমায়
দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত কাজ, মানসিক চাপ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব থেকে তৈরি হতে পারে বার্নআউট। এ অবস্থায় শুধু কাজের দক্ষতাই কমে না, পাশাপাশি উদ্বেগ, হতাশা, ঘুমের সমস্যা ও নানা শারীরিক অসুস্থতাও দেখা দিতে পারে। পরিকল্পিত ছুটি শরীর ও মনকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি কমে এবং বার্নআউটের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হয়।
নতুন চিন্তার জন্ম দেয় ছুটি
একই পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাজ করতে থাকলে চিন্তাভাবনাও অনেক সময় একই গণ্ডির মধ্যে আটকে যায়। কাজ থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে নতুন কোনো জায়গায় যাওয়া, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা নিজের পছন্দের কাজে মন দেওয়া মস্তিষ্ককে নতুন অভিজ্ঞতার সুযোগ দেয়। এর ফলে কাজে ফেরার পর নতুন ধারণা ও সৃজনশীল চিন্তা মাথায় আসতে পারে। বিশেষ করে লেখালেখি, নকশা, পরিকল্পনা ও সমস্যা সমাধানের মতো কাজে এই বিরতি বেশ কার্যকর হতে পারে।
সম্পর্কের জন্যও প্রয়োজন ছুটি
কর্মজীবনের ব্যস্ততায় পরিবার, বন্ধু কিংবা নিজের জন্য সময় বের করা অনেকের কাছেই কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে ব্যক্তিগত সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হতে পারে। ছুটি সেই সম্পর্কগুলোকে সময় দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। প্রিয়জনদের সঙ্গে নির্ভার সময় কাটালে মানসিক প্রশান্তি বাড়ে, যা পরোক্ষভাবে কর্মজীবনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
Descansos programados y salud mental | Centro Médico ABC
বিশ্রামের পর বাড়ে উৎপাদনশীলতা
ছুটি নিলে কাজ জমে যাবে এমন আশঙ্কা অনেকের মধ্যেই থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পর্যাপ্ত বিশ্রামের পর কাজে ফিরলে কর্মীর মনোযোগ ও দক্ষতা বাড়তে পারে। সতেজ মস্তিষ্কে কম সময়ে বেশি কাজ করা সম্ভব হয় এবং ভুলের সম্ভাবনাও কমে। অর্থাৎ বেশি সময় কাজ করলেই বেশি উৎপাদনশীল হওয়া যায় না। অনেক সময় সঠিক সময়ে নেওয়া একটি বিরতিই কাজের মান বাড়াতে পারে।
ছুটি মানেই ভ্রমণ নয়
ছুটি কাটানোর জন্য সব সময় দূরে কোথাও যেতে হবে, এমন নয়। নিজের বাড়িতে থেকে বিশ্রাম নেওয়া, বই পড়া, সিনেমা দেখা, রান্না করা, বাগান করা কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোও কার্যকর বিরতি হতে পারে। ছুটির মূল উদ্দেশ্য হলো দৈনন্দিন কাজের চাপ থেকে সাময়িকভাবে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া এবং মানসিকভাবে পুনরুজ্জীবিত হওয়া।
কাজে ফেরার আগে রাখুন প্রস্তুতির সময়
দীর্ঘ ছুটি শেষে হঠাৎ করে আগের মতো ব্যস্ত কর্মসূচিতে ফিরে যাওয়া অনেকের জন্য চাপ তৈরি করতে পারে। তাই সম্ভব হলে কাজে ফেরার আগে এক থেকে দুই দিনের একটি ‘বাফার টাইম’ রাখা ভালো। এতে মানসিকভাবে কাজের পরিবেশে ফিরে আসার প্রস্তুতি নেওয়া যায়।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়তে পরিশ্রম অবশ্যই প্রয়োজন। তবে টানা কাজ করে যাওয়াই সাফল্যের একমাত্র পথ নয়। শরীর ও মনের প্রয়োজন বুঝে সময়মতো বিরতি নেওয়াও কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই কাজের পাশাপাশি নিজের জন্য সময় বের করা এবং প্রয়োজনমতো ছুটি নেওয়া কর্মদক্ষতা কমায় না; বরং দীর্ঘদিন ভালোভাবে কাজ করে যাওয়ার শক্তি জোগায়।





















