সারাদেশ

ঢাকায় সংযুক্তিতে শিক্ষক, মূল বিদ্যালয়ে পাঠদান ব্যাহত; হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর মুছে ফেলার অভিযোগ

  শাহনেওয়াজ শাহ, বিজয়নগর প্রতিনিধি: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৩:৪০:২৭ প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার হরষপুর ইউনিয়নের নিদারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সৌরভী খানম দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় সংযুক্তিতে দায়িত্ব পালন করায় তার মূল কর্মস্থলে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে মূল বিদ্যালয়ে যোগদান না করেই হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর এবং পরে সেই স্বাক্ষর মুছে ফেলার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

এ ঘটনায় স্থানীয় অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিলেও অভিযোগ ওঠার প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সৌরভী খানম ২০২০ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। এরপর তিনি বিজয়নগর উপজেলার হাজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৪ বছর ১১ মাস কর্মরত ছিলেন। পরে ২০২৫ সালে অনলাইন বদলি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একই উপজেলার নিদারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে ১৬ ফেব্রুয়ারি যোগদান করেন।

তবে বদলির প্রায় সাত মাসের মধ্যেই তিনি ঢাকার গুলশান এলাকার কালাচাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক বছরের জন্য সংযুক্তিতে যান। সেখানে প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালনের পর চলতি বছরের ২৫ মার্চ পুনরায় অধিদপ্তর থেকে সংযুক্তির আদেশ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে, নিদারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আগে থেকেই শিক্ষক সংকট রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক বর্তমানে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকায় সংকট আরও প্রকট হয়েছে। ফলে সৌরভী খানমের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদান ও শ্রেণি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ অভিভাবক ও স্থানীয়দের।

সৌরভী খানমের বিরুদ্ধে আরও একটি অভিযোগ উঠেছে গত ২৭ জুলাইয়ের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, ওইদিন তিনি ঢাকার সংযুক্তি বিদ্যালয়ে দায়িত্বে না থেকে হঠাৎ মূল কর্মস্থল নিদারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যান। সেখানে কোনো ধরনের যোগদানপত্র না দিয়েই হাজিরা খাতায় উপস্থিতির স্বাক্ষর করেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, পরে একই দিন বিকেল ৩টার দিকে তিনি বিদ্যালয়ে গিয়ে হাজিরা খাতায় দেওয়া নিজের স্বাক্ষর ফ্লুইড দিয়ে মুছে ফেলেন। এ ঘটনায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে সৌরভী খানমের বক্তব্য নিতে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ফোন রিসিভকারী একজন নিজেকে তার বোন পরিচয় দেন। পরে তিনি কথা শেষ না করেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরবর্তীতে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিজয়নগর উপজেলা শিক্ষা অফিসার স্বর্ণজিৎ দেব বলেন, “একজন সহকারী শিক্ষক সংযুক্তিতে থাকার পর মূল বিদ্যালয়ে যোগদান না করে হঠাৎ এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দেওয়া এবং পরে তা মুছে ফেলা মারাত্মক অন্যায়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”

ঢাকার গুলশান এলাকার কালাচাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, “সৌরভী খানম সংযুক্তিতে আমাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তিনি ২৬ ও ২৭ জুলাই দুই দিন ছুটিতে ছিলেন। তবে কেন তিনি ২৭ জুলাই মূল বিদ্যালয়ে গিয়ে হাজিরা খাতায় উপস্থিতির স্বাক্ষর দিয়েছেন, সেটি আমি সঠিক বলতে পারছি না।”

তিনি বিষয়টি সংযুক্তি বিদ্যালয়ের আওতাভুক্ত শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানার পরামর্শ দেন।

গুলশান থানা শিক্ষা অফিসার মাহরুক জাবীন বলেন, “একজন শিক্ষক সংযুক্তি বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় মূল বিদ্যালয়ে গিয়ে দৈনিক হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করা অন্যায়। একজন শিক্ষক একই দিনে কীভাবে দুটি প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি দেন, সেটি বুঝতে পারছি না। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।”

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংযুক্তি সংক্রান্ত নীতিমালায় মৌলিক প্রশিক্ষণ, সাময়িক বরখাস্ত, মাতৃত্বকালীন ছুটি কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষকস্বল্পতার কারণে পাঠদান বিঘ্নিত হলে সংযুক্তির ব্যবস্থা করার সুযোগ রয়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, সুনির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ করে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য সংযুক্তির আদেশ দেওয়া যেতে পারে। মেয়াদ শেষ হলে সংযুক্তির আদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার কথা। একই শিক্ষককে একাধিকবার সংযুক্তির সুযোগ নেই বলেও নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু হানিফ বলেন, “সৌরভী খানম এর আগেও এক বছর ঢাকার গুলশানের একটি বিদ্যালয়ে সংযুক্তিতে ছিলেন। তিনি আবারও এক বছরের জন্য সংযুক্তির আদেশ করেছেন বলে শুনেছি।”

স্থানীয়দের প্রশ্ন, একই শিক্ষককে পুনরায় সংযুক্তির সুযোগ কীভাবে দেওয়া হলো এবং মূল কর্মস্থলে যোগদান না করেই হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে পরে তা মুছে ফেলার অভিযোগের পরও কেন এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে মূল কর্মস্থলের বাইরে দায়িত্ব পালনের কারণে নিদারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা।

আরও খবর

Sponsered content